পুলিশের ভুলে ১২ দিন কারাগারে কাটলো লিটনের

‘পুলিশকে বলেছিলাম, আমার বিরুদ্ধে কোনও মামলা নেই। আমি খারাপ কাজেও জড়িত নই। ব্যবসা করে সংসার চালাই। আমার মোবাইলে থাকা এনআইডি কার্ডও পুলিশকে দেখিয়েছিলাম। আমার কোনও কথা শোনেনি পুলিশ।’

বিনা দোষে ১২ দিন কারাভোগ করে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বাংলা ট্রিবিউনকে এসব কথা বলেন মো. লিটন (৪০)। মঙ্গলবার (২০ ডিসেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টায় মুক্তি পান তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডাকাতির প্রস্তুতির মামলার আসামির সঙ্গে লিটনের নাম ও বাবার নাম মিল থাকায় তাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। কিন্তু মায়ের নাম, বয়স ও ঠিকানা ভিন্ন। লিটনের বাড়ি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ভায়েরখীল এলাকায় আশ্রয়ণ প্রকল্পে। তিনি শুকলালহাট বাজারে রাব্বি মেটাল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ নামের একটি আলমারির দোকানের মালিক। কিন্তু মামলায় এজাহারভুক্ত আসামির বাড়ি ওই ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মিয়াজিপাড়া এলাকায়। দুজনের বাড়ির দূরত্ব তিন কিলোমিটারের বেশি। দুজনের বাবার নাম মো. এসহাক।

লিটন বলেন, ‘সীতাকুণ্ডের শুকলালহাট বাজারে রাব্বি মেটাল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ নামে আমার একটি আলমারির দোকান আছে। গত ৯ ডিসেম্বর থানা থেকে এক পুলিশ কর্মকর্তা ফোন করে বলেন, থানায় আসতে হবে। থানার একটি আলমারিতে রঙ করতে হবে বলে আমাকে থানায় ডেকে নিয়ে যান। এরপর পুলিশ বলেছে, আমি নাকি ডাকাতির প্রস্তুতি মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি। আমি অনেক বলেছি, আমার বিরুদ্ধে কোনও মামলা নেই। খবর পেয়ে আমার পরিবারের সদস্যরা থানায় এসে পুলিশকে অনেক বুঝিয়েছে তারা কোনও কথা শোনেনি। আমাকে ভুয়া মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে।’

ভুক্তভোগী বলেন, ‘পুলিশের দায়িত্বহীনতার কারণে আমি ১২টি দিন কারাগারে কাটিয়েছি। কোনও অপরাধ না করেও কারাভোগ করেছি। আমি গরিব মানুষ। জামিন নিতে গত ১২ দিনে কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ব্যবসায় ক্ষতি হয়েছে। মানসম্মান গেছে। এলাকার মানুষ মনে করছে, আমি কোনও অপরাধ করে কারাগারে এসেছি। আমি এর বিচার চাই। আমার মতো নির্দোষ ব্যক্তিকে যারা বিনা দোষে যারা কারাভোগ করিয়েছে তাদের শাস্তি চাই।’

স্থানীয়দের দাবি, লিটনকে পুলিশে ধরিয়ে দিতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছেন নুরুজ্জামান নামে পুলিশের এক সোর্স। এই নুরুজ্জামানকে নিয়ে আতঙ্কে থাকেন সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড এলাকার অনেক লোক।

মো. লিটন কারাগার থেকে বের হবেন এ কারণে মঙ্গলবার সকাল থেকে কারা ফটকে অপেক্ষায় ছিলেন তার কলেজ পড়ুয়া ছেলে মো. নুর উদ্দিন (১৮) ও একাধিক স্বজন। বেলা সাড়ে ১১টায় মো. লিটন কারাগার থেকে বের হওয়ার পর আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তারা। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন লিটন।

ছেলে নুর উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি এইচএসসির ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র। আমার বাবাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে শোনা মাত্রই থানায় গিয়েছিলাম। পুলিশকে বলেছি, বাবার বিরুদ্ধে কোনও মামলা নেই। বাবা কোনও অপরাধী নন। পুলিশ কথা শোনেনি। কোনও যাচাই-বাছাই না করে বাবাকে কোর্টে প্রেরণ করেছে। অপরাধ না করেও আমার বাবা ১২ দিন কারাভোগ করেছেন। আর যেন কোনও নিরপরাধ লোক কারাগারে না যায়, আমি এ দাবি করছি।’ 

চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী ভবতোষ নাথ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিনা দোষে পুলিশের ভুলে জেলহাজতে থাকা লিটনের জামিনের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়। এরপর আদালত গত বৃহস্পতিবার সীতাকুণ্ড থানা পুলিশকে ঘটনার সত্যতা যাচাই করে তিন দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। সোমবার আদালতে প্রতিবেদন দেন থানার ওসি তোফায়েল আহমেদ। প্রতিবেদনে গ্রেফতার লিটন ওই মামলার প্রকৃত আসামি নন বলে উল্লেখ করেন। এটি তাদের অনিচ্ছাকৃত ভুল বলেও আখ্যা দিয়েছেন। প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আদালত কারাগারে থাকা লিটনকে মুক্তির আদেশ দেন।’

চট্টগ্রাম চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. জয়নাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সীতাকুণ্ড থানা পুলিশের প্রতিবেদন পাওয়ার পর আদালত সোমবার কারাগারে আটক লিটনকে মুক্তির আদেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রকৃত আসামিকে গ্রেফতারের জন্য নতুন করে পরোয়ানা জারি করেছেন।’

ছেলের সঙ্গে লিটন

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মো. এমরান হোসেন মিঞা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আদালত থেকে জামিননামা আসার পর যাচাই-বাছাই শেষে মঙ্গলবার সকালে লিটনকে মুক্তি দেওয়া হয়।’

আদালতে জমা দেওয়া সীতাকুণ্ড থানার ওসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘সীতাকুণ্ড মডেল থানার মামলা নং-১৭(৬)১৪, জিআর নং-১৮৮/১৪(সীতাকুণ্ড), ধারা ৩৯৯/৪০২ পেনাল কোড এবং টিআর-৫৯৫/২০১৭ইং। এ মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি সীতাকুণ্ড থানার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের এসহাকের নতুন বাড়ির (বঙ্গের পাড়া) মিয়াজী পাড়ার মো. এসহাকের ছেলে মো. লিটনের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানাটি এসআই মোতাব্বির হোসেনের নামে দিই। এসআই গত ৯ ডিসেম্বর লিটনকে গ্রেফতার পূর্বক আদালতে প্রেরণ করেন। পরে গ্রেফতার লিটনের নামে অন্য কোনও ব্যক্তি কিংবা একই নামের কোনও ব্যক্তি রয়েছে কি-না সরেজমিন অনুসন্ধানের নির্দেশ প্রদান করি। গ্রেফতারের সময় লিটন তার জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শন করতে পারেননি। এ ছাড়া গ্রেফতার আসামি তার নামে একটি মামলা আছে জানালেও মামলার সূত্র উল্লেখ করতে পারেনি।’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘মামলার সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামির নাম, বাবার নাম, ঠিকানা ও সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নে অবস্থিত। আদালতের আদেশনামা পেয়ে থানার রেকর্ডপত্র যাচাইপূর্বক জানা গেছে, গ্রেফতার ব্যক্তির নামে মামলা থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে তাকে শনাক্ত করে। এতে লিটনকে গ্রেফতারপূর্বক আদালতে পাঠানো হয়। যা উক্ত এসআই কিংবা আমার একান্তই অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি। ভবিষ্যতের এমন কাজে অধিকতর সতর্ক থাকবো। অতএব, প্রার্থনা এই যে, আমার কার্য প্রক্রিয়া ও অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি সু-বিবেচনা পূর্বক আমাকে প্রথমবারের মতো মার্জনা করে অত্র ব্যাখ্যার দায় থেকে অব্যাহতি দানে আপনার সদয় মর্জি হয়।’

সীতাকুণ্ড থানা সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের ১০ জুন রাতে উপজেলার কুমিরা ইউনিয়নের কাজীপাড়া এলাকায় ডাকাতির প্রস্তুতিকালে ছয় জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই দিন প্রকৃত আসামি লিটনকেও গ্রেফতার করে। পর দিন গ্রেফতার ছয় জনসহ অজ্ঞাত আরও পাঁচ থেকে ছয় জনকে আসামি করে সীতাকুণ্ড থানায় একটি মামলা করেন তৎকালীন এসআই মো. ইকবাল হোসেন। এরপর জামিনে এসে লিটন পালিয়ে যান। পরে আদালত এ মামলার রায়ে লিটনকে এক বছরের সাজা দেন। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়, ‘২০১৪ সালের ১১ জুন করা মামলায় আসামি লিটনের বয়স দেওয়া হয়েছিল ২০ বছর। সে হিসেবে বর্তমানে তার বয়স হওয়ার কথা ২৮ বছর। তার মায়ের নাম হাবা খাতুন ও বাড়ি বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের মিয়াজিপাড়া গ্রামে। কিন্তু বর্তমানে কারাগারে থাকা লিটনের বয়স ৪০ বছর। মায়ের নাম ছায়েরা বেগম ও বাড়ি বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের ভায়েরখীল এলাকায়।

সীতাকুণ্ড থানার ওসি তোফায়েল আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নাম, বাবার নাম ও ঠিকানা এক হওয়াতে একজনের স্থলে আরেকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এটি কোনও ইচ্ছাকৃত কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুল নয়। এটি অনিচ্ছাকৃত ভুল। বিষয়টি আমরা আদালতকে বুঝিয়েছি। আদালত সেটি বুঝেছেন।’

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) এস এম শফিউল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি আমি অবগত নই। আমি খোঁজ-খবর নেবো। কেন এমন হয়েছে তা যাচাই করে দেখা হবে।’

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম আদালতের বিশিষ্ট আইনজীবী ও বিশিষ্ট মানবাধিকার সংগঠক জিয়া হাবিব আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এক আসামির স্থলে নিরীহ ব্যক্তিকে পুলিশ ধরে নিয়ে কারাগারে পাঠাবে এটি কোনও সভ্য দেশের কাজ হতে পারে না। আধুনিক যুগে অনলাইন ডাটাবেজ সিস্টেম থাকার পরও পুলিশ তাদের মজ্জাগতভাবে এমন কাজ করবে তা মানা যায় না। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক কাজ এবং সম্পূর্ণ মানবাধিকার লঙ্ঘন। এর সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। নিরীহ মানুষকে কারাগারে পাঠানোর কারণে তার যে সামাজিক ক্ষতি হয়েছে এর জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া প্রয়োজন।’

সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, ‘লিটনকে যখন গ্রেফতার করা হয়েছিল তখন নিশ্চয় সে বলেছিল, ওই মামলার আসামি নয়। তার কথা শুনে পুলিশকে এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে যাচাই-বাছাই করা উচিত ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘একজনের স্থলে অপরজনের কারাভোগের ঘটনা চলতি বছর অন্তত ৫ থেকে ৬টি উদঘাটিত হয়েছে। এরপরও পুলিশ কেন সতর্ক হচ্ছে না বুঝে উঠতে পারছি না। পুলিশের খামখেয়ালীর কারণে লিটন বিনা দোষে কারাভোগ করেছে। বিষয়টি শুধুই কী ভুল নাকি প্রকৃত আসামিকে বাঁচানোর জন্য পুলিশের কোনও ফন্দি? বিষয়টি তদন্ত করে উদঘাটন করা প্রয়োজন। যাতে এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে।’