কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে অপহরণের শিকার আট বাংলাদেশি মুক্তিপণ দিয়েই চার দিন পর অপহরণকারীদের কাছ থেকে ছাড়া পেয়েছেন। তাদের উদ্ধারে কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকায় পুলিশ ড্রোন দিয়ে অভিযান চালালেও শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগীদের পরিশোধ করতে হয়েছে মুক্তিপণের টাকা। তবে প্রথমদিকে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা এই অপহরণ করেছে বলে ধারণা করা হলেও পুলিশ বলছে, বাংলাদেশের সন্ত্রাসীরাই এই কাণ্ড ঘটিয়েছে।
বুধবার (২১ ডিসেম্বর) গভীর রাত ৩টায় ছয় লাখ ৪০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পান টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া এলাকার এই আট বাসিন্দা। ভোর ৪টায় ফেরত আসা ভুক্তভোগীদের প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর টেকনাফ মডেল থানার পুলিশ তাদের নিয়ে জাহাজপুরা পাহাড়ি এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে।
বৃহস্পতিবার বিকালে জাহাজপুরা এলাকায় অভিযান শেষে কথা হয় অপহৃত নুরুল আবছারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘চার দিন আমাদের ঘুমাতে দেয়নি। কী পরিমাণ নির্যাতন করেছে তা ভাষা প্রকাশ করা যাবে না। তারা (সন্ত্রাসীরা) খুব ভয়ঙ্কর। মনে হচ্ছে, মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছি। তাদের সবার মুখোশ পরা ছিল। তাদের ল্যাপটপসহ বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্র ছিল। তাদের বড় একটি নেটওয়ার্ক রয়েছে। কারণ তাদের কাছে ভারী অস্ত্রশস্ত্র আছে।’
কাঁদতে কাঁদতে এই ভুক্তভোগী বলেন, ‘যতবার পুলিশ পাহাড়ে অভিযান পরিচালনা করতে প্রবেশ করেছে, তত বেশি আমাদের ওপর নির্যাতন করেছে। আমাদের হাত, মুখ ও চোখ বাঁধা অবস্থায় ছিল। তাদের একমাত্র টার্গেট ছিল, যেকোনও বিনিময়ে মুক্তিপণ (টাকা) আদায় করা। আমরা ভয়ে ছিলাম, অভিযানের কারণে যদি টাকা না পায় তারা (সন্ত্রাসীরা) আমাদের হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। এক পর্যায়ে পাহাড়ে ড্রোনসহ পুলিশের চিরুনি অভিযান শুরু করলে, তাদের মাঝেও কিছুটা চাপ দেখা যায়। পরে মুক্তিপণের টাকার অঙ্ক কমিয়ে দেয়। অবশেষে আমি দুই লাখ টাকা দিয়ে ছাড়া পেয়েছি। প্রথমে অপহরণকারীরা ছয় জনকে ছেড়ে দেয়। মুক্তিপণের টাকার জন্য আমিসহ ছলিম উল্লাহকে আটকে রাখে। পরে ছয় লাখ ৪০ হাজার টাকা পাওয়ার পর আমরাও ছাড়া পাই।’
এ বিষয়ে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মাহফুজুল ইসলাম বলেন, ‘টেকনাফের বাহারছড়া থেকে আট জনকে রোহিঙ্গারা নয়, বাংলাদেশি সন্ত্রাসীরাই অপহরণ করেছিল। অপহৃতরা বুধবার রাতে ফিরে আসার পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।’
তিনি বলেন, ‘অপহরণের পর থেকে আমরা কয়েকটি পাহাড়ে ড্রোন উড়িয়ে অপহরণকারীদের শনাক্তসহ উদ্ধারে চিরুনি অভিযান চালিয়েছি। এর চাপে অপহরণকারীরা তাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। ভুক্তভোগীদের চিকিৎসা শেষে জিজ্ঞাসাবাদ করছি। এর পেছনে যারাই জড়িত থাকুক কেউ রেহাই পাবে না।’
মৃত্যুর কাছ থেকে ফেরত আসা আট জন হলেন- জাহাজপুরা এলাকার বাসিন্দা রশিদ আহমদের ছেলে মোহাম্মদ উল্লাহ, একই এলাকার ছৈয়দ আমিরের ছেলে মোস্তফা কামাল ও করিম উল্লাহ, মমতাজ মিয়ার ছেলে মো. রিদুয়ান, রুস্তম আলীর ছেলে সেলিম উল্লাহ, কাদের হোসেনের ছেলে নুরুল হক ও নুর মোহাম্মদ এবং রশিদ আহমদের ছেলে কলেজ পড়ুয়া নুরুল আবছার।
করিম উল্লাহ ও মোস্তফার বড় ভাই মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, ‘মুক্তিপণ দিয়েই ভাইয়েরা ডাকাত দলের হাত থেকে ছাড়া পেয়েছে। তারা (অপহৃত) ফিরে আসার পরপরই তাদের জিজ্ঞেস করেছি। তারা বলেছে, টাকা দিয়েই ফিরে এসেছে। তবে পুলিশ তাদের নিয়ে যাওয়াতে বিস্তারিত জানতে পারিনি।’
তবে অপহৃতদের অন্যান্য স্বজনরা মুক্তিপণের বিষয়ে কথা বলতে রাজি না হলেও মুক্তিপণের জন্য টাকা জমা করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
বৃহস্পতিবার সকালে থানা প্রাঙ্গণে অপহৃত নুরুল হকের ভাই মো. উল্লাহ বলেন, ‘চার দিন পর অপহরণকারীরা আমার ভাইসহ ধরে নিয়ে যাওয়া আট জনকে ছেড়ে দিয়েছে। রাত ৩টায় আমরা তাদের জাহাজপুরা বনিছড়া খাল থেকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করি। তাদের সবাইকে নির্মমভাবে মারধর করেছে অপহরণকারীরা। আর একদিন হলে হয়তো আমার ভাই মারা যেত। আমার ভাইসহ সবাইকে থানায় নিয়ে এসে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছে।’ তবে তিনি মুক্তিপণের বিষয়ে কিছু বলেননি।
তবে ফেরত আসা ভাইয়ের বরাত দিয়ে মো. উল্লাহ আরও বলেন, ‘গতকাল পাহাড়ে পুলিশের অভিযানের সময় তারা (অপহৃতরা) পুলিশের দলকে দেখতে পায়। কিন্তু মুখে কাপড় বাঁধা থাকার কারণে চিৎকার করতে পারেনি। তবে অভিযানিক দলকে দেখে অপহরণকারী তাদের অস্ত্র তাক করেছিল। আর একটু সামনে এগোলেই সংঘাতের সম্ভাবনাও ছিল।’
মো. রিদুয়ানের বাবা মমতাজ মিয়া বলেন, ‘রাত ৩টায় ছেলে ফিরে এসেছে। কিন্তু তার শরীরে ব্যাপক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ছেলেকে জীবিত ফিরে পেয়েছি, এর চেয়ে বড় আর কী হতে পারে। তবে ভোরে পুলিশ এসে ছেলেকে নিয়ে গেছে। তাদের ফিরে পেয়ে আমরা সবাই অনেক খুশি।’
বাহারছড়ার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীসহ অপহৃত আট জন ফিরে এসেছে। হয়তো পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের চাপের মুখে পড়ে সন্ত্রাসীরা তাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। এর আগে অপহরণের পর পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করে আসছে তারা।’
গত রবিবার (১৮ ডিসেম্বর) বিকালে টেকনাফের বাহারছড়ার জাহাজপুরা এলাকার একটি পাহাড়ঘেঁষা খালে মাছ ধরতে গেলে সন্ত্রাসীদের একটি দল ওই আট জনকে অপহরণ করে। পরে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করে সন্ত্রাসীরা। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পাহাড়ে ড্রোনসহ চিরুনি অভিযান শুরু করে। এ ঘটনায় অপহৃত করিম উল্লাহর ভাই মোহাম্মদ হাবীব বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার রাতে টেকনাফ মডেল থানায় মামলা করেন।