দুই বিচারকসহ নাজিরের অপসারণ চেয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সব আদালত তিন দিনের জন্য বর্জন করেছেন জেলার আইনজীবীরা। বৃহস্পতিবার (৫ জানুয়ারি) সকাল থেকে আদালত বর্জন করে জেলা আইনজীবী সমিতির সামনে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন তারা।
এতে জেলা জজ আদালত, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসহ সবকটি আদালতের বিচারিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় দূরদূরান্ত থেকে আসা বিচারপ্রার্থীরা ভোগান্তিতে পড়েছেন।
প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য দেন জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট তানভীর ভূঁইয়া, সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান বাবুল, সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম লিটন ও মাহবুবুল আলম খোকন।
গত ২ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারকের সঙ্গে আইনজীবীদের বাগবিতণ্ডার জেরে এ ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে। এ নিয়ে বৃহস্পতিবার বিকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি, সম্পাদকসহ তিন আইনজীবীর প্রতি আদালত অবমাননার রুল জারি করেন হাইকোর্ট।
আইনজীবীদের অভিযোগ, গত ১ ডিসেম্বর বিকালে মামলা করতে গেলে তা গ্রহণ না করে জেলার আইনজীবীদের নিয়ে আপত্তিকর ও অপমানজনক মন্তব্য করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুন্যাল-১-এর বিচারক। এর প্রতিবাদে গত ২৬ ডিসেম্বর সভা করে ১ জানুয়ারি থেকে সংশ্লিষ্ট আদালত বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয় জেলা আইনজীবী সমিতি। সেইসঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগে আদালতের নাজির মুমিনকে প্রত্যাহারের দাবি জানান আইনজীবীরা। অথচ তাকে রক্ষায় জেলা জজের ইন্ধনে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে কর্মসূচি পালন করেছেন বিচার বিভাগীয় কর্মচারীরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিন দিনের জন্য সব আদালত বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন আইনজীবীরা। দাবি আদায় না হলে কর্মসূচি চলমান থাকবে। এ ঘটনার জন্য জেলা জজকে দায়ী করে তিন জনের অপসারণ দাবি করেন তারা।
অপরদিকে বিচার বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, আইনজীবীরা বিচারকসহ বিচার বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, বিচারিক কাজে হস্তক্ষেপ ও কর্মচারীদের মারধর করেছেন। এ ঘটনায় বুধবার দিনব্যাপাী জেলা জজ আদালত এবং চিফ জুডিশিয়াল আদালতের কার্যক্রম বন্ধ রাখেন তারা।
আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ডিসেম্বর জেলা জজ আদালত এক মাসের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হওয়ার আগমুহূর্তে গত ১ ডিসেম্বর জেলা আইনজীবী সমিতির তিন সদস্য মানবিক কারণ দেখিয়ে তিনটি মামলা নেওয়ার জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মোহাম্মদ ফারুকের আদালতে যান। তারা বিচারকের কাছে মামলাগুলো গ্রহণের আর্জি জানান। কিন্তু বিচারক তিন আইনজীবীর মামলা গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি তানভীর ভূঁইয়া এবং সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান আইনজীবীদের পক্ষে বিচারকের কাছে মানবিক দিক বিবেচনা করে মামলা তিনটি নেওয়ার অনুরোধ জানান। তাদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন বিচারক। ২৬ ডিসেম্বর এ নিয়ে বৈঠক করেন জেলা আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দ। ওই বৈঠক থেকে বিচারক ফারুকের আদালত বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন আইনজীবীরা।
১ জানুয়ারি থেকে আইনজীবীরা ওই বিচারকের আদালত বর্জন করে আসছিলেন। তবে বর্জনের পরও বিচারক আদালত পরিচালনার খবর পেয়ে আইনজীবীরা ওই আদালতে যান। সেখানে তারা আদালত পরিচালনায় আপত্তি জানান। একপর্যায়ে বিচারকের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়ান। এর প্রতিবাদে বুধবার সকাল থেকে দিনব্যাপী বিচার বিভাগীয় কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের ব্যানারে আদালতের কার্যক্রম বন্ধ রেখে মানববন্ধনসহ কর্মসূচি পালন করা হয়।
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট তানভীর ভূঁইয়া বলেন, ‘জেলা জজ শারমিন নিগারের ওপর আমরা আস্থা হারিয়েছি। বুধবার তার মদতে কনফারেন্স রুমে মিটিং করে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা আদালতে তালা দিয়েছেন। এটি নজিরবিহীন ঘটনা। বিচারক মোহাম্মদ ফারুক আহমেদ আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছেন। আমরা তার প্রতিবাদে আদালত বর্জন করেছি। আগামী সোমবার সাধারণ সভা ডেকেছি। সেই সভা থেকে নতুন কর্মসূচি দেবো।’
জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান বাবুল বলেন, ‘বুধবার জেলা জজের প্রত্যক্ষ মদতে প্রশাসনের কর্মচারীরা আদালতের সব দরজা বন্ধ করে মানববন্ধন করেছেন। প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ হাজার বিচারপ্রার্থী আদালতে বিচারের জন্য আসেন। এতে তারা ভোগান্তিতে পড়েছেন। এজন্য আমরা জেলা জজকে দায়ী করছি। এরই প্রতিবাদে তিন দিনের আদালত বর্জনের কর্মসূচি দিয়েছি আমরা। জেলা জজ শারমিন নিগার, নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মোহাম্মদ ফারুক আহমেদ ও নাজির মোমিনুল ইসলামের অপসারণ দাবি করছি আমরা। তাদের অপসারণ না করলে আন্দোলন চালিয়ে যাবো।’
জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আদালত চলাকালীন এজলাসে বিচারকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন আইনজীবীরা। এ সময় আপিল সহকারী মেহেদী হাসানকে কয়েকজন আইনজীবী মারধর করে মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে যান। বিচার ব্যবস্থা সুষ্ঠু ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা লিখিতভাবে বিষয়টি আইনমন্ত্রী, আইন সচিব ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে জানিয়েছি। এরপরও সমাধান না পাওয়ায় কর্মবিরতি পালন করেছি। জেলা জজের বিরুদ্ধে আইনজীবীদের আনা অভিযোগ মিথ্যা। তাদের বক্তব্য আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। এখানে জেলা জজের কোনও ভূমিকা নেই। আমাদের কর্মসূচি নিজস্ব। আমরা নিরাপত্তার স্বার্থে এবং কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কর্মসূচি পালন করেছি।’
এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিচার বিভাগীয় কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শরিফ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা যারা বিচার বিভাগের কর্মচারী আছি, তারা দেখেছি এখানে নিরাপত্তার অভাব আছে। বিচারপ্রার্থীরা এখানে আসেন বিচার পাওয়ার আসায়। অথচ আমরা নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছি। যেখানে একজন বিচারকের ওপর হামলা, বিচারকের সঙ্গে খারাপ আচরণ ও আপিল সহকারীর ওপর হামলা হয়, সেখানে বিচারের সুষ্ঠু পরিবেশ থাকে না। আমরা চাই আদালতে সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরে আসুক।’
আদালতে তালা দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আদালতের মূল ফটক খোলা ছিল। এজলাসগুলোতে তালা দেওয়া হয়েছিল। আইনজীবীরা দফায় দফায় মিছিল করেছেন। তারা আদালতে হামলা করতে পারেন এমন আশঙ্কায় কাগজপত্র রক্ষণাবেক্ষণের স্বার্থে এবং আমাদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে এজলাসগুলোতে তালা দেওয়া হয়েছে।’