মশার ওষুধ কিনে ‘ফাঁসছেন’ চসিকের কর্মকর্তারা

দরপত্র আহ্বান না করেই এক ছাত্রলীগ নেতার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে গত এক বছরে ১৬ বার জরুরি ভিত্তিতে মশার ওষুধ কেনার অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) বিরুদ্ধে। এমন অভিযোগ পেয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রাথমিক অনুসন্ধানে ওষুধ কেনায় চসিকের নয়-ছয়ের তথ্য খুঁজে পেয়েছে কমিশন।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ দরপত্র আহ্বান না করেই ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মোট ১৬ বার মশার ওষুধ কিনেছে। এসব ওষুধ কেনায় ব্যয় হয়েছে ৭৭ লাখ ৩৭ হাজার ৩০০ টাকা। ১৬ বারই ওষুধ কেনা হয় চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক অরভিন সাকিব ইভানের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স বেঙ্গল মার্ক ইন্টারন্যাশনালের কাছ থেকে।

অভিযোগ আছে, মশা নিধনের ওষুধ কেনায় বেশিরভাগ সময় নিয়ম ভঙ্গ করে চলেছে সিটি করপোরেশন। সরকারি তহবিলের টাকায় কেনাকাটা করতে হয় ই-জিপির (ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট) মাধ্যমে। দিতে হয় দরপত্র বিজ্ঞপ্তি। কিন্তু কোনও প্রকার দরপত্র না দিয়ে ইচ্ছেমতো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে কেনা হয় মশা নিধনের ওষুধ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চসিকের কয়েকজন ঠিকাদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পর পর ১৬ বার কীভাবে এক প্রতিষ্ঠান মশা নিধনের ওষুধ সরবরাহের কাজ পান। এর পেছনে চসিকের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসূত্র রয়েছে। এখানে বড় অঙ্কের কমিশন বাণিজ্য হয়েছে। শুধু মশার ওষুধই নয়, এ ধরনের টেন্ডার ছাড়া যেসব কাজ দেওয়া হয় সবগুলোতেই অনিয়ম রয়েছে।’

এদিকে, গত বৃহস্পতিবার (৯ ফেব্রুয়ারি) চসিকের মশা নিধনের ওষুধ কেনায় অনিয়ম খতিয়ে দেখতে দুদক চট্টগ্রাম-১-এর সহকারী পরিচালক মো. এমরান হোসেনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের এনফোর্সমেন্ট টিম অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানের সত্যতা নিশ্চিত করে এই কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দরপত্র ছাড়াই মশার ওষুধ কেনার অভিযোগ উঠেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অভিযান চালানো হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘অভিযানকালে রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মশার ওষুধ কেনার বরাদ্দ করা অর্থ থেকে ১৬ বারে ৭৭ লাখ ৩৭ হাজার ৩০০ টাকার ওষুধ কেনা হয়। সিটি করপোরেশন ওই ক্রয় কার্যক্রম পিপিআর-২০০৮ মোতাবেক উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে সম্পন্ন না করে পিপিআর-২০০৮-এর বিধি ৭৪(১) ও বিধি ৭৭ লঙ্ঘন করেছে। সামগ্রিক চুক্তি/ক্রয়াদেশকে ছোট ছোট সংখ্যায় ও মূল্য সীমায় বিভক্ত করে প্রতিবারে পাঁচ লাখ টাকার কম মূল্যের দরপত্র আহ্বান করা হয়। সিটি করপোরেশন বেআইনিভাবে নগরের অরভিন সাকিব ইভানের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স বেঙ্গল মার্ক ইন্টারন্যাশনালকে লাভবান করার জন্য সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ১৬ বার কার্যাদেশ দিয়েছে।’

অভিযোগ উঠেছে, সিটি করপোরেশন পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে মশা নিধনের ওষুধ কিনতেই টেন্ডার প্রক্রিয়ায় যায়নি। তারা ক্রয়বিধির ৭৬ (ট) ধারা (পিপিআর) ব্যবহার করে এসব ওষুধ কিনেছে। অথচ এই ধারা অনুযায়ী অতি জরুরি বা প্রয়োজনীয় পণ্য, কার্য এবং সেবা ক্রয় করার কথা। এর মাধ্যমে প্রতিটি ক্ষেত্রে পাঁচ লাখ টাকার বেশি কেনাকাটা করা যাবে না। এ কারণে পাঁচ লাখ টাকার মধ্যে রেখে একাধিক বারে এসব ওষুধ কেনা হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স বেঙ্গল মার্ক ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক অরভিন সাকিব ইভান বাংলা ট্রিবিউনের কাছে দাবি করেন, ‘আমি একজন ঠিকাদার। সিটি করপোরেশন মশা নিধনের ওষুধ কেনার জন্য কোটেশন আহ্বান করেছে। এতে অন্যান্য আরও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আমার প্রতিষ্ঠানও অংশ নিয়েছিল। আমি সর্বনিম্ন দরদাতা ছিলাম বলেই আমি কাজ পেয়েছি।’

তিনি আরও দাবি করেন, ‘সিটি করপোরেশন এটা ভালো না খারাপ করেছে এটি তাদের বিষয়। এখানে আমি সর্বনিম্ন দরদাতা ছিলাম বলেই কাজ পেয়েছি। আমার স্থানে অন্য কেউ সর্বনিম্ন দরদাতা হলে তারা পেতেন। চসিক মশার ওষুধ ছাড়াও বিভিন্ন কেনাকাটাও ইজিপি ছাড়াও এভাবে কিনে থাকেন। এটা সিটি করপোরেশনের নিজস্ব এখতিয়ার।’

এ প্রসঙ্গে সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবুল হাশেম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ক্রয়বিধির ৭৬ (ট) ধারা (পিপিআর) অনুযায়ী পাঁচ লাখ টাকার কম কেনাকাটায় ই-জিপির মাধ্যমে টেন্ডার আহ্বান করতে হবে না। পাঁচ লাখ টাকার বেশি হলে সেক্ষেত্রে ই-জিপিতে যেতে হয়। এখানে কোনও অনিয়ম হয়নি। এটা ধরা দুদকের কাজ নয়। এটা চাইলে অডিট বিভাগ ধরতে পারবে।’

তিনি বলেন, ‘এসব কেনাকাটা আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগের। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছিল। যে কারণে জরুরি ভিত্তিতে ২০ লাখ টাকার ওষুধ কেনা হয়।’