তিন ধাপে রাঙ্গামাটি পৌর এলাকার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত পৌর মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী। দীর্ঘদিন পৌরবাসী উন্নয়ন বঞ্চিত ছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যেই পৌর এলাকার আমূল পরিবর্তন আনা হবে। এজন্য ড্যাপ (ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান)-এর পাশাপাশি উন্নত শহরগুলোর অবকাঠামো অনুসরণ করা হবে বলে তিনি জানান।
বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাঙ্গামাটি জেলা প্রতিনিধি জিয়াউল হক।
প্রশ্ন: প্রথমবারের মতো নির্বাচন করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে কেমন লাগছে?
মেয়র : আসলে এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। জীবনে প্রথম নির্বাচন করেছি। আর তাতেই বিপুল ভোটে বিজয়ী, সত্যিই অন্যরকম ভালো লাগার অনুভূতি। দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন। আর শহরের মানুষ আমার প্রতি স্বতঃস্ফুর্ত সমর্থন ও ভালোবাসা দেখিয়েছে। আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞ।
প্রশ্ন: দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কাজ কি হবে আপনার?
মেয়র: সব সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানই হবে আমার প্রথম কাজ। কারণ শান্তি ও সম্প্রীতি না থাকলে উন্নয়ন সুষ্ঠুভাবে এগোয় না। তাই সব সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে বসে এবং তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করে প্রথমে পারস্পরিক সহাবস্থানটা নিশ্চিত করবো।
প্রশ্ন : পৌর এলাকার ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারে আপনার উদ্যোগ বা পরিকল্পনা কেমন হবে?
মেয়র: ভু-স্বর্গ নামে খ্যাত পর্যটন নগরী রাঙামাটিতে প্রতিবছরই হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক আসে। কিন্তু, এ শহরের অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে দুর্গন্ধ। শহরের ৭-৮ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে যাতে কোনও দুর্গন্ধ না থাকে সেজন্য প্রথমেই ব্যবস্থা নেবো। দোকান এবং বাসার ময়লা-আবর্জনা যাতে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা হয় সে ব্যাপারে সবার সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেবো। ভোর হওয়ার আগে এবং রাত ৯টার পর পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা এসব বর্জ্য নিয়ে যাবে। এজন্য পৌরবাসীর সচেতনতার পাশাপাশি সহযোগিতা প্রয়োজন।
প্রশ্ন : শহরে প্রবেশের মুখেই ময়লা আবর্জনার স্তুপ, দুর্গন্ধের কারণে পর্যটকদের মনে শহর সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়। এই বর্জ্য ফেলার জন্য আলাদা কোনও স্থান নির্ধারণের চিন্তা-ভাবনা আছে কি?
মেয়র : এখন এমন হয়ে গেছে যে, সব জায়গাই দখল হয়ে যাচ্ছে। লোকজন বুঝতেই চায় না কোথায় বসবাস করা যাবে, আর কোথায় যাবে না। শহরের সৌন্দর্য্য বর্ধনের স্বার্থে এবং দুর্গন্ধমুক্ত রাখতে আবর্জনা ফেলার স্থান পরিবর্তনের বিষয়েও ভেবে দেখবো।
প্রশ্ন : পৌর এলাকার উন্নয়নে আপনার পরিকল্পনা কি?
মেয়র: আসলে আমাদের এই শহরই গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। এখন যে সব এলাকা অনুন্নত বিশেষ করে লেকের মধ্যস্থান ও বস্তি এলাকাগুলোর উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের জন্যও বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিশেষ করে লেকের মধ্যখানে অবস্থিত এলাকাগুলোর লোকজন স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই শহরের নির্দিষ্ট পয়েন্টগুলোতে স্বাস্থ্য ক্যাম্প স্থাপন করবো যাতে লোকজন অন্তত প্রাথমিক চিকিৎসা সুবিধাটা পায়।
প্রশ্ন : চিকিৎসা সুবিধার জন্য আর কোনও উদ্যোগ নেওয়া হবে ?
মেয়র: এখানে আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে অ্যাম্বুলেন্স। প্রায়ই জরুরি রোগীদের ঢাকা-চট্টগ্রাম নিয়ে যেতে বিড়ম্বনায় পড়তে হবে। তাই চেষ্টা করবো পৌরসভার জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে।
প্রশ্ন : ড্যাপ বাস্তবায়নে আপনার পরিকল্পনা কি?
মেয়র : রাঙামাটি শহরের যে ড্যাপটি আছে সেটি পাকিস্তান আমলের। ওটার সঙ্গে বর্তমান অবস্থার অনেক ফারাক। নিজস্ব একটি পরিকল্পনার মাধ্যমে তিন বছরের মধ্যে এই শহরের পরিবর্তন করবো। অতীতের মেয়র অপরিকল্পিতভাবে কিছু কাজ করেছে যেমন ট্রাক টার্মিনালের পাশে যে ল্যান্ডিং ঘাট। ওটা অপ্রয়োজনীয় এবং এটার জন্য প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। তাছাড়া এটি বাঁধের সৌন্দর্যও নষ্ট করছে। তাই পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করবো। যাতে লোকজন নিরাপদে চলাচল করতে পারে আর বাঁধের সৌন্দর্য ঠিক থাকে।
প্রশ্ন : ফিশারি বাঁধের সৌন্দর্য বৃদ্ধি নিয়ে কোনও পরিকল্পনা আছে কিনা।
মেয়র: ফিশারি বাঁধটি অত্যন্ত চমৎকার একটি স্থান। এটির দুই পাশে দুইটি স্থাপনা নির্মাণ করবো যাতে লোকজন সহজেই এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে।
প্রশ্ন : পর্যটন শহর হিসেবে রাঙামাটির সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে আপনার পরিকল্পনা কি?
মেয়র : অবশ্যই আমার নিজস্ব একটি মিশন আর ভিশন আছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনোদনের জন্য শহরের উঁচু কোনো স্থানে একটি ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করবো। যার উচ্চতা হবে ছয়তলা। ওখান থেকে একসঙ্গে একশ থেকে দেড়শ’ লোক যাতে পুরো শহর আর লেকটি এক নজর দেখতে পারে সেভাবে করা হবে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলাপ করে শিশু পার্কটিও পৌরসভার তত্ত্বাবধানে নিয়ে নিব। এছাড়াও শহরের প্রবেশ দ্বারে সিটি গেইট করারও পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রশ্ন : রাতের শহর নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কি?
মেয়র: রাঙামাটিবাসীকে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাপ্তাই হাইড্রলিক প্রজেক্ট সৃষ্টি করা হলেও, সেই সুবিধা আদৌও রাঙামাটিবাসী ভোগ করতে পারেনি। রাতের শহর যাতে সব সময় আলোময় থাকে সেজন্য সোলার প্যানেল বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। যাতে বিদ্যুৎ চলে গেলেও পুরো শহর আলোময় থাকে।
প্রশ্ন : পৌর ভবনের পাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হবে কি?
মেয়র: সদ্য সাবেক হওয়া মেয়র সাইফুল ইসলাম ভুট্টো মানবিক দিক বিবেচনা করে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের জন্য জায়গা কিনে দিয়েছেন। তারপরও কিছু বসতি রয়েছে। পৌরসভার স্বার্থে যা যা করা প্রয়োজন তাই করবো।
প্রশ্ন: বর্তমান মেয়র যেসব কাজ এবং পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন সেসব কি বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিবেন নাকি নতুন পরিকল্পনা করবেন?
মেয়র: আমি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নই। ভুট্টো ভাই (সদ্য সাবেক মেয়র সাইফুল ইসলাম ভুট্টো) কষ্ট করে যে সব কাজ এনেছেন অবশ্যই সে সব বাস্তবায়ন করা হবে। নাগরিক সুবিধার জন্য উপযোগী কাজ অবশ্যই বাস্তবায়ন করবো। পাশাপাশি তার নেওয়া পরিকল্পনার মধ্যে যেসব কাজ পজেটিভ হবে সেসব বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রশ্ন: দেশ ডিজিটালকরণ হচ্ছে। শহরে ডিজিটাল ছোঁয়া দিতে আপনার পরিকল্পনা কেমন?
মেয়র: প্রথমে পৌর ভবনের আশেপাশে ওয়াই ফাই জোন করবো। পরে শহরের চারটি পয়েন্ট-রিজার্ভ বাজার, তবলছড়ি, বনরূপা ও কলেজ গেইট এলাকায় ওয়াই ফাই জোন করার পরিকল্পনা আছে। এসব কাজ করার জন্য সবার সহায়তা চাইবো।
প্রশ্ন: মিডিয়ার কাছে কেমন সহযোগিতা চান।
মেয়র: ক্লিন সিটি ও গ্রিন সিটি করার জন্য সবার সহযোগিতা চাইবো। আশাকরি বস্তুনিষ্ট সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি তারা আমাকে সহযোগিতা করবেন।
/জেবি/টিএন/
আপ-এসটি