ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার বিশ্বরোড। ব্যস্ততম এই সড়কে এসে হিজড়ার কবলে পড়েননি এমন কাউকে পাওয়া যাবে না। কখনও ১০ টাকা কখনও হাজার টাকা। টাকা দিতে না পারলে নানা অঙ্গভঙ্গি দিয়ে একরকম বাধ্য করে টাকা নেওয়া হয়।
এমন চিত্র শুধু কুমিল্লার বিশ্বরোড এলাকায় নয়; জেলার প্রত্যেক উপজেলার বড় বাজার, সড়ক-মহাসড়কের পরিবহনেও একই দৃশ্য নিয়মিত দেখা যায়।
এসব অভিযোগ কুমিল্লার অনেকের। কেউ কেউ মৌখিক অভিযোগ করেছেন প্রশাসনের কাছে। এত অভিযোগের পরও সাবলীলভাবে হিজড়ারা বলছেন, কাজ দেবেন না, জোর করে না নিলে খাবো কী? আমাদের এ অবস্থার জন্য কারা দায়ী, তাদের খুঁজুন।
অধিকারকর্মীরা বলছেন, পরিবার থেকে অবহেলা ও বিচ্ছিন্ন হয়ে রাস্তায় নামার পর তাদের যেভাবে জীবনযাপন করতে হয়, সেখানে যৌক্তিক আচরণ আশা করা অযৌক্তিক। তাদের কাজ দেওয়া ও একইসঙ্গে ‘স্বাভাবিক’ জীবনে ফেরার সুযোগ করে দিতে হবে।
কুমিল্লার প্রবেশপথ ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড, জাঙ্গালিয়া বাসস্টেশন, শাসনগাছা বাসস্টেশন, লাকসাম বাজার, মুদাফরগঞ্জ বাজার, বরুড়া বাজার, চৌদ্দগ্রামের মিয়া বাজার, বাতিসা, চৌদ্দগ্রাম বাজার, বুড়িচংয়ের কাবিলা বাজার ও নিমসার বাজারসহ ২০টির বেশি স্থানে হিজড়াদের চাঁদা আদায়ের তথ্য জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা।
কুমিল্লা থেকে চৌদ্দগ্রামগামী যমুনা সার্ভিসের যাত্রী এমদাদুল ইক বলেন, ‘হিজড়া ধরলে টাকা দিতেই হয়। অনেক সময় খুচরা টাকা থাকে না। তখন যা দিই, তা আর ফেরত দেয় না তারা।’
সন্তান জন্ম দেওয়ার এক সপ্তাহ পর বাড়িতে এসে হিজড়ারা টাকা দাবি করেন, না দিলে শিশুটিকে নিয়ে যাবেন বলে হুমকি দেন—এমনটি জানালেন কুমিল্লা শহরের বাসিন্দা ফাতেমাতুজ জোহরা।
পাশাপাশি তিনি এও বলেন, ‘তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করলে কখনও সহিংস হয় না। আমরা তাদের দেখে যেমন ভয় পেতে থাকি, তাতে তারা খারাপ বোধ করেন। তবে এটাও সত্য, সরকারের উচিত তাদের বিষয়টি দেখা। এভাবে জনে জনে হয়রানি করলে তাদের প্রতি মানুষ বিরাগ হবে।’
অনেক সময় তাদের টাকা না দিলে নানা ধরনের হুমকি দেন বলে উল্লেখ করেছেন কুমিল্লা জজ কোর্টের আইনজীবী ফাহমিদা জেবীন। তিনি বলেন, ‘তারা আমার পারিবারিক এক অনুষ্ঠানে ২০ হাজার টাকা দাবি করেছিলেন। পরে আমার নাম বলাতে মিষ্টির জন্য কিছু টাকা নিয়ে চলে গেছেন। তারা সবাই আমাকে চেনেন এবং জানেন। তাই কম টাকায় রাজি হয়েছেন। না হলে এক টাকাও কম নিতেন না।’
চাঁদা আদায়ের উপলক্ষ
স্থানীয় সূত্র জানায়, বিয়ে, শিশুর জন্ম, নাম রাখা অনুষ্ঠান, সুন্নতে খাতনাসহ সামাজিক যেকোনো অনুষ্ঠানে আসে হিজড়ার দল। এ সময় ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করে তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হিজড়াদের কয়েকজন টিম লিডার জানিয়েছেন, এসব অনুষ্ঠান বা ‘খেপ’ বা ‘পার্টির’ সন্ধান দেয় স্থানীয় একটি চক্র। এই চক্র সন্ধান দিয়ে হিজড়াদের কাছ থেকে চাঁদার ভাগ নেয়। এ ছাড়া বাসার জানালা কিংবা ছাদে শিশুদের কাঁথা শুকাতে দেখে তথ্য নেয়। বাবুর্চিদের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের খবর নেয়, কাজিদের মাধ্যমে বিয়ের খবর পায়, বাড়িতে লাইটিং কিংবা ডেকোরেশন দেখেও খবর নেয় তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টাকা আদায়ের জন্য প্রত্যেক বাজার কিংবা এলাকাভিত্তিক মৌখিক কমিটি আছে তাদের। কেউ কমিটির বাইরে গিয়ে কোনও কাজ করলে হিজড়া কমিটি বা দল থেকে বের করে দেওয়া হয়। তার ভরণপোষণ কিংবা চাঁদা আদায়ের সব রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
হিজড়ারা কেন চাঁদাবাজিতে?
হিজড়াদের কাছ থেকে ‘স্বাভাবিক’ আচরণ প্রত্যাশা করা যায় না বলে উল্লেখ করেছেন জাতীয় মহিলা সংস্থা কুমিল্লার চেয়ারম্যান পাপড়ী বসু। তিনি বলেন, ‘তাদের সমাজচ্যুত হওয়ার নেপথ্যে সমাজের এক শ্রেণির মানুষ দায়ী হলেও পরিবার সেক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায়ী। তৃতীয় লিঙ্গের হওয়ায় মূলত পরিবার ও সমাজ থেকে নিগৃহীত হয় এই জনগোষ্ঠী। তাই হতাশা, হীনম্মন্যতা ও আত্মবিশ্বাস হারিয়ে তারা দলভুক্ত হয়। এতে স্বাভাবিক জীবনযাপনের বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। তাই স্বাভাবিক মানুষের মতো সব কাজ করতে সক্ষম হওয়ার পরও কাজ না করে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে। সেইসঙ্গে জোর-জবরদস্তি করে চাঁদা আদায় করে তারা। ইদানীং তাদের আচরণে উগ্রতা বেশি লক্ষ্য করছি। তবে তা আমরা সমাধানে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’
স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে উদ্যোগ
পাপড়ী বসু বলেন, ‘হিজড়ারা সমাজ থেকে বঞ্চিত হলেও সমাজের দায়িত্ববান মানুষ কখনও তাদের এড়িয়ে যেতে পারেন না। তাদের অধিকার, পাওনা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমরা না দাঁড়ালে কে দাঁড়াবে? আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। না হয় আগামী প্রজন্ম একটি অসুস্থ সমাজে বেড়ে উঠবে।’
একটি চক্র এই অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে অপকর্মে লেলিয়ে দিচ্ছে বলেও উল্লেখ করেছেন পাপড়ী বসু। তিনি বলেন, ‘কুমিল্লার সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার তাদের নিয়ে ভিন্ন একটি উদ্যোগ নিয়েছেন। তাদের জন্য ‘হিজড়া পল্লি’ করার ঘোষণা দিয়েছেন। সেইসঙ্গে তাদের কর্মক্ষম করে তুলতে সমাজসেবা অধিদফতরের সমন্বয়ে প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন কর্মে দক্ষ করে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন। তাদের মাঝে সেলাই মেশিন বিতরণ, বিভিন্ন সময় আর্থিক অনুদানসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু তারা কিছুদিন ঠিক থাকার পর আবার ফিরে যায় আগের জীবনে।’
হিজড়াদের আয়ের ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সমাজসেবা অধিদফতর কুমিল্লার উপপরিচালক জেড. এম. মিজানুর রহমান খান। তিনি বলেন, ‘আমরা আগেও বহুবার চেষ্টা করেছি। স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে তাদের জন্য সেমিনার করেছি। মোটিভেশনাল কর্মশালা করেছি। তাদের আয়ের ব্যবস্থার উদ্যোগ নিয়েছি। অবেহেলিত এই জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ, মানুষকে হয়রানি করে চাঁদাবাজি থেকে ফেরাতে যা যা করা দরকার, সবই করেছে সরকার। কিন্তু কোনও এক কারণে তারা আবারও রাস্তায় ফিরে চাঁদাবাজি শুরু করে। ইদানীং এই মাত্রা আরও বেড়েছে।’
কুমিল্লায় অফিসিয়ালি তিন শতাধিক হিজড়া আছে উল্লেখ করে উপপরিচালক জেড. এম. মিজানুর রহমান বলেন, ‘এর বাইরেও কিছু আছে। তবে ওই সংখ্যাটা বেশি নয়। আমরা তাদের সেলাই মেশিন দিয়েছি। তারা বিক্রি করে ফেলেছে। আবারও দেখছি, তাদের জন্য কী করা যায়।’
হিজড়া কারা?
কুমিল্লার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী বলেন, ‘মেডিক্যাল সায়েন্স কখনও একজন মানুষকে হিজড়া বলতে পারে না। তাদের বলা হয়, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। তারাও স্বাভাবিক মানুষ। প্রকৃতপক্ষে তৃতীয় লিঙ্গের একজন মানুষ যৌন প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্ম নেয়। যারা ক্রোমোজমের ত্রুটি ও জটিলতার কারণে জন্মগতভাবে যৌন প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়ে জন্ম নিয়েছে, তাদের তৃতীয় লিঙ্গ বলা হয়।’
একজন স্বাভাবিক মানুষ থেকে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের কোনও পার্থক্য নেই জানিয়ে ডা. নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী বলেন, ‘শুধুমাত্র লিঙ্গ পার্থক্যের কারণে তাকে তৃতীয় লিঙ্গের বলা হয়। তারা ডাক্তার হতে পারেন, শিক্ষক হতে পারেন, অথবা অন্য পেশারও হতে পারেন। এতে কোনও সমস্যা নেই।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হিজড়া তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে বলেন, ‘আমাদের কেউ কাজ দেয় না। এমন কোনও মানুষ নেই, যারা আমাদের দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয় না। ছোটবেলায় বাসা থেকে বের করে দিয়েছে। এখন বলেন, আমরা খাবো কী, থাকবো কোথায়? আমরা মরে যাই, সেটাই চায় সবাই? মানুষকে ভয় দেখাতে আমরা কেউ চাই না। মানুষ অহেতুক আমাদের দেখে ভয় পায়।’
এসব বিষয়ে জানতে কুমিল্লা শহর হিজড়াদের সর্দার নাদিরার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে পাওয়া যায়নি।