দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। এই মহাসড়কে অন্য মহাসড়কের চেয়ে দ্বিগুণ মানুষজন যাতায়াত করেন। সেইসঙ্গে কুমিল্লা-নোয়াখালী, কুমিল্লা-চাঁদপুর আঞ্চলিক সড়ক, কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে যাতায়াত করেন লাখ লাখ মানুষজন। করোনার বিধিনিষেধের কারণে গত তিন বছর দক্ষিণের এসব সড়কে ঈদযাত্রায় যানজট ছিল না। তবে এবার করোনার সংকট না থাকায় চাপ বাড়বে। বিষয়টি মাথায় রেখে ঈদযাত্রা নিরাপদ ও ভোগান্তিমুক্ত করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে হাইওয়ে পুলিশ, সড়ক ও জনপথ এবং পরিবহন সংগঠনের নেতারা।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মহাসড়কে তিন চাকার যান চলাচল ও চাঁদাবাজি বন্ধ, দুর্ঘটনা রোধে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ, মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী বাজার বসতে না দেওয়া এবং কঠোর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। এসব কারণে ঈদযাত্রা স্বস্তির হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাইওয়ে পুলিশের উদ্যোগ
হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ রহমত উল্লাহ বলেন, ‘ঈদযাত্রা নিরাপদ ও স্বস্তির করতে সব প্রস্তুতি নিয়েছি আমরা। ইতোমধ্যে যানবাহনের মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বৈঠক করেছি। তাদের বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছি। রিজিয়নের ২২টি থানা-ফাঁড়ি এলাকায় ৬৪টি পেট্রোল টিম থাকবে। পাশাপাশি জরুরি সেবায় থাকবে ৩০টি কুইক রেসপন্স টিম। যেকোনো দুর্ঘটনা বা প্রতিবন্ধকতা দূর করতে পাঁচটি সরকারি ও ১২টি বেসরকারি রেকার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত সংখ্যক অ্যাম্বুলেন্স থাকছে দুর্ঘটনায় হতাহতের সেবার জন্য।’
সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া মহাসড়কে যানবাহন না থামানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে রহমত উল্লাহ বলেন, ‘এতে নির্বিঘ্নে যান চলাচল করতে পারবে। দুটি গোয়েন্দা টিম কাজ করবে। একটি পূর্ণাঙ্গ কন্ট্রোলরুম থাকছে। পাশাপাশি থাকছে পাঁচটি সাব-কন্ট্রোলরুম। ৮২১ কিলোমিটার জাতীয় ও আঞ্চলিক সড়কে কোথাও কোনও সংগঠন কিংবা চক্র চাঁদাবাজি করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি এবার ঈদে বিশেষ ইউনিফর্মে হাইওয়ে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের ১০০ প্রশিক্ষিত সদস্য মাঠে থাকবে বলেও জানান পুলিশ সুপার মুহাম্মদ রহমত উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘একটি স্পেশাল টিমসহ মহাসড়কে শৃঙ্খলা তদারকি করবো আমি। অবশ্য সবার আগে মালিক, চালক ও যাত্রীদের পরিবহন আইন মানতে হবে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি নামানো যাবে না। অনাকাঙ্ক্ষিত কোনও দুর্ঘটনা না ঘটলে এবারও দক্ষিণের ঈদযাত্রা হবে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক।’
সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের উদ্যোগ
ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবেন বলে জানালেন সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীতি চাকমা। তিনি বলেন, ‘হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে আলোচনা করে চান্দিনা ও গৌরীপুর এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। কারণ এসব স্থানে যানজট ও দুর্ঘটনা ঘটে। এরই মধ্যে সড়কের যেসব স্থান ভাঙা ছিল আমরা মেরামত করে দিয়েছি। আমিরাবাদ ও হাসানপুর এলাকায় সড়কের উন্নয়নকাজ চলছে। এ জন্য সড়কের একপাশ কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখা হয়। তবে এতে যানজট লাগার সম্ভাবনা নেই। যদি যানজট লাগে আমরা হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জরুরিভাবে খুলে দেবো। তবে দক্ষিণের সড়ক এবারও যানজটমুক্ত থাকবে এবং ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন হবে।’
টার্মিনাল ছাড়া যাত্রী ওঠানো নিষেধ
ঈদ ঘিরে সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে টার্মিনাল ছাড়া যাত্রী ওঠাতে চালক-হেলপারদের নিষেধ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন শাসনগাছা বাস মালিক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক জামিল আহমেদ খন্দকার।
তিনি বলেন, ‘প্রশাসনের সঙ্গে পরিবহন সমিতির নেতাদের আলোচনা হয়েছে। সেখানে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। টার্মিনাল ছাড়া যাত্রী ওঠানামা করাতে নির্দেশনা দিয়েছি চালকদের। কাজেই যানজট হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্দিষ্ট সময়ে টার্মিনাল থেকে গাড়ি ছাড়ার ব্যবস্থা করা হবে। অতিরিক্ত চালক-হেলপার নিয়োগ দিয়ে সেবা নিশ্চিত ও যাতায়াত নিরাপদ করা হবে। কোথাও গাড়ি থামালে কিংবা চাঁদাবাজি হলে তা পুলিশকে জানাতে হবে চালকদের। পুলিশ সহযোগিতা করবে। আশা করছি, গত তিন বছরের মতো এবারও এই পথে ঈদযাত্রা হবে স্বস্তির।’
বাস মালিক সমিতি কুমিল্লা জেলার কার্যকরী সভাপতি তাজুল ইসলাম বলেন, ‘টার্মিনাল ছাড়া কোথাও থেকে যাত্রী ওঠানামা করানো যাবে না। বিষয়টি কঠোরভাবে বলে দেওয়া হয়েছে চালকদের। পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন, বাস-ট্রাক মালিক সমিতি ও চালক সমিতির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তারা বিষয়গুলো পালন করবেন বলে জানিয়েছেন আমাদের।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন স্কুল-কলেজ বন্ধ। তাই সড়কের কোথাও যানজটের শঙ্কা নেই। তবে সড়কের উন্নয়নকাজ চলমান থাকায় কিছু অংশে একলেনে গাড়ি চলছে। সেখানে যানজট লাগার শঙ্কা আছে। আমরা সড়ক বিভাগের দায়িত্বশীলদের বিষয়টি জানিয়েছি, তারা বলেছেন সমস্যা নেই।’
টার্মিনাল ছাড়া কোথাও বাস দাঁড়ালে ব্যবস্থা
ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে টার্মিনাল ছাড়া কোথাও বাস দাঁড়ালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানালেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, ‘সড়কে চাঁদাবাজি ও সব রকমের অপরাধের বিরুদ্ধে মাঠে কঠোর অবস্থানে থাকবে পুলিশ। কাজেই কোনও ধরনের বিশৃঙ্খলা হবে না।’
যা বলছেন চালক ও যাত্রীরা
কুমিল্লা-ঢাকা মহাসড়কে আট বছর ধরে গাড়ি চালান মো. সফিউল্লাহ। বর্তমানে তিশা পরিবহনের চালক। মহাসড়কের যানজট লাগার কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মাঝ রাস্তায় বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করলে যানজট লাগে, দুর্ঘটনাও ঘটে। আবার গাড়ি থামিয়ে চাঁদাবাজি করলে সড়ক বন্ধ থাকে। যদিও এখন এসব কমে গেছে। আশা করি, গত বছরগুলোর মতোই রাস্তা ক্লিয়ার থাকবে এবং যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হবে না।’
কুমিল্লা-ঢাকা মহাসড়কে নিয়মিত যাতায়াতকারী মনির হোসেন বলেন, ‘ঈদের সময় দাউদকান্দি টোলপ্লাজায় যানজট লাগে। এ ছাড়া দক্ষিণের সড়কে যানজট লাগে না। দাউদকান্দি টোলপ্লাজায় কম সময়ে টোল আদায় করা গেলে দুই-আড়াই ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা থেকে কুমিল্লায় আসা যায়।’