চট্টগ্রামে পাহাড় কেটে ১২ তলা ভবন বানাচ্ছে এপিক প্রপার্টিজ। অভিযান চালিয়ে মামলা ও জরিমানা করার পরও ভবন নির্মাণের কাজ অব্যাহত রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। নগরীর চকবাজার থানার চট্টগ্রাম কলেজ রোড সংলগ্ন পার্সিভ্যাল হিল কেটে এই ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। নাম দেওয়া হয়েছে ‘এপিক ভূঁইয়া এম্পেরিয়াম’।
পাহাড় কেটে বহুতল ভবন নির্মাণ করায় আবাসন প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে পরিবেশ অধিদফতর। মামলাটি এখনও আদালতে বিচারাধীন। এরই মধ্যে গোপনে নির্মাণকাজ অব্যাহত রেখেছে তারা। ইতোমধ্যে পাঁচ তলার ভীত তৈরি করে ফেলা হয়েছে।
পরিবেশ অধিদফতর সূত্র জানায়, পার্সিভ্যাল হিল নামের পাহাড়টি কাটার দায়ে ২০১৯ সালের ২৭ অক্টোবর এপিক প্রপার্টিজকে ৯৬ হাজার টাকা জরিমানা করেছিল পরিবেশ অধিদফতর। ২০২১ সালের ১৭ জুলাই পাহাড় কাটার সময় এপিক প্রপার্টিজের চার শ্রমিককে আটক করে পুলিশ। আটক শ্রমিকরা এপিক ভূঁইয়া এম্পেরিয়াম ভবনের নির্মাণকাজে নিয়োজিত ছিলেন। তখন তাদের বিরুদ্ধে চকবাজার থানায় মামলা করা হয়।
পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, মামলা ও জরিমানা করেও পার্সিভ্যাল হিল কাটা থেকে এপিক প্রপার্টিজকে বিরত রাখা যাচ্ছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি আমরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম নগর কার্যালয়ের পরিচালক হিল্লোল বিশ্বাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পার্সিভ্যাল হিলে ভবন নির্মাণের জন্য এপিক প্রপার্টিজকে কোনও ধরনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণের ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছি আমরা। ওই মামলার তদন্তে পাহাড় কাটার সত্যতা পাওয়া গেছে। আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। মামলাটি বিচারাধীন। যেহেতু মামলার পরও ভবন নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে সেহেতু বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হবে। আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবো আমরা।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, পার্সিভ্যাল হিল কেটে নির্মাণ করা হচ্ছে বহুতল ভবন। এখনও পাহাড় কাটার কাজ চলমান। দিন-রাত সমানতালে কাজ করছেন শ্রমিকরা।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, শুধুমাত্র জরিমানা ও মামলা করে দায় সারছে পরিবেশ অধিদফতর। কার্যকর কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছে না। যার ফলে পাহাড় কাটা বন্ধ হচ্ছে না। হয়তো মামলা ও আদালতকে তোয়াক্কা করছেন না ভবন নির্মাণকারীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এপিক প্রপার্টিজের বিরুদ্ধে নগরীর বিভিন্ন স্থানে পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণের অভিযোগ আছে। নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার লিংক রোডের আরেফিন নগর এলাকায় পাহাড় কেটে ‘এপিক রেডিমিক্স কনক্রিট’ নামে কারখানা নির্মাণ করা হয়েছে।
তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এপিক প্রপার্টিজের কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণ করা হয়নি।
আদালত সূত্র জানায়, পার্সিভ্যাল হিল কেটে এপ্রিক প্রপার্টিজের বহুতল ভবন নির্মাণ মামলার তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেছে। তদন্ত শেষে পাঁচ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন পরিবেশ অধিদফতরের পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত হোসেন। মামলার এহাজারভুক্ত আসামিরা হলেন চকবাজার থানার পার্সিভ্যাল হিল এলাকার মৃত খায়ের উল্লাহ ভূঁইয়ার ছেলে খোরশেদ আলম ভূঁইয়া, নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার কৃষ্ণপুর এলাকার মোহাম্মদ নেছার আলীর ছেলে মো. বকুল আলী, নগরীর চান্দগাঁও থানার হামিদচর এলাকার মো. তাইজ উদ্দিনের ছেলে মো. আশরাফুল ইসলাম মিন্টু, বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার তেঁতুলিয়া পূর্বপাড়া এলাকার মো. শহিদুল ইসলাম প্রামাণিকের ছেলে মো. সজীব ইসলাম ও মহাদেবপুর উপজেলার চান্দনাইশ গ্রামের মৃত কলিম উদ্দিনের ছেলে মো. রবিউল। পাহাড় কেটে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতি করায় বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০)-এর ১২, ৪(১), (২) ও ১৫ (১) এর ক্রমিক ১ ও ৫ নম্বর ধারা লঙ্ঘনের অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। অভিযোগপত্রে চার জনকে সাক্ষী রাখা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০২১ সালের ১৭ জুলাই চকবাজার থানার কাশিমবাজার মৌজার বিএস খতিয়ান নং-৪১/৬, বিএস দাগ নং-২৮৮ (অংশ), ২৮৯ (অংশ) ও ২১১(অংশ)-এর পার্সিভ্যাল হিল এলাকায় পাহাড় কাটার স্থান পরিদর্শন করেন পরিবেশ অধিদফতরের পরিদর্শক মনির হোসেন। পাহাড় কাটার সময় চার শ্রমিককে আটক করা হয়। পরে পরিবেশ অধিদফতর মহানগর কার্যালয়ের পরিচালকের নির্দেশে আবারও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পরিদর্শক মনির। ওই সময় তদন্তে দুই হাজার ৪০০ ঘনফুট পাহাড় খোরশেদ আলম ভূঁইয়ার নির্দেশে কাটা হয় বলে প্রমাণ পান পরিদর্শক।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, চকবাজার এলাকার পার্সিভ্যাল হিল ভূ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও অক্সিজেনের আধার। অথচ এসবের ক্ষতি করে পরিবেশ অধিদফতরের শর্ত ভেঙে বহুতল ভবন করছে এপিক প্রপার্টিজ।
চট্টগ্রাম পরিবেশ আদালতের বেঞ্চ সহকারী আলাউদ্দিন তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছেন। এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়েছে। আগামী ধার্য তারিখে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ হবে।’
মামলার পরও পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে এপিক প্রপার্টিজের পরিচালক আরিফুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পার্সিভ্যাল হিলের জমিটি ব্যক্তি মালিকানাধীন। পরিবেশ অধিদফতর মামলা দিয়েছে। আদালতে মামলা বিচারাধীন। আদালত কাজ বন্ধ রাখার কোনও নির্দেশনা দেননি। যার কারণে ভবনের নির্মাণকাজ অব্যাহত রেখেছি আমরা।’
তিনি আরও বলেন, ‘নগরীতে ভবন নির্মাণের দেখভাল করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। সংস্থাটি আমাদের ভবনের অনুমোদন দিয়েছে। তাদের অনুমোদন নিয়েই আমরা ভবন নির্মাণ করছি।’
চট্টগ্রামের পরিবেশ সাংবাদিক ও বেলার নেটওয়ার্ক মেম্বার আলীউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পার্সিভ্যাল হিল পুরোটাই পাহাড়। প্রভাবশালী এবং আবাসন প্রতিষ্ঠানের মালিকরা পাহাড়টি এখন শেষ করে দিয়েছে। এখানে বিভিন্ন ভবনের নকশার অনুমোদন দিয়েছে সিডিএ। পাহাড়ে কীভাবে ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়, তা আমার বুঝে আসে না। যারা ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিচ্ছেন তাদের কোনও দায়বদ্ধতা নেই। এমনকি জবাবদিহিতা এবং তদারকি না থাকায় দিনের পর দিন পাহাড় ও টিলা কেটে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এসবে জড়িত সিডিএর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের কাছে অসহায় পরিবেশ অধিদফতরও। এ জন্য জরিমানা কিংবা মামলা দিয়ে দায় সারছে তারা।’