লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে মো. সজিব হোসেন (৩০) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন; তাকে কৃষক দলের কর্মী বলে দাবি করেছে বিএনপি। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন। এ সময় পুলিশের ২০-২৫ সদস্য আহত হয়েছেন।
নিহত সজিব হোসেন চন্দ্রগঞ্জ থানা কৃষক দলের সদস্য ও চরশাহী ইউনিয়নের নুরুল্লাপুর গ্রামের আবু তাহেরের ছেলে বলে জানিয়েছেন চন্দ্রগঞ্জ থানা বিএনপির সদস্যসচিব আনোয়ার হোসেন।
মঙ্গলবার (১৮ জুলাই) বিকালে বিএনপির পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে জেলা শহরের সামাদ মোড় সংলগ্ন কলেজ রোডের পুকুর পাড়ে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের পর মদিন উল্লাহ হাউজিংয়ের একটি বাসার সিঁড়িরুম থেকে লাশটি উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে নিয়ে যায় পুলিশ।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবুল খায়ের ভুঁইয়া দাবি করেন, ‘সামাদ স্কুল মোড়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সজিবের ওপর হামলা চালান। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি মদিন উল্লাহ হাউজিংয়ের একটি বাড়ির নিচে গিয়ে আশ্রয় নেন। সেখানেই তার মৃত্যু হয়।’
পুলিশ ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার বিকাল ৪টার দিকে শহরের গোডাউন রোড এলাকার বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানীর বাসভবন থেকে পদযাত্রা কর্মসূচি শুরু হয়। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে রামগতি সড়কের আধুনিক হাসপাতালের কাছে পদযাত্রায় বাধা দেয় পুলিশ। এ সময় পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে পদযাত্রা সামনের দিকে এগিয়ে যায়। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় সামাদ মোড়, জেলা শহরের ঝুমুর সিনেমা হল এলাকা, রামগতি সড়কের আধুনিক হাসপাতাল, মটকা মসজিদ এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। আত্মরক্ষায় লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল এবং রাবার বুলেট ছোড়ে পুলিশ। এতে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি হাসান মাহমুদসহ ৫০ জন গুলিবিদ্ধ ও আহত হন। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
জেলা সদর হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘হাসপাতালে আহত অবস্থায় অনেকে এসেছেন। তাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধও রয়েছেন। তাদের চিকিৎসা চলছে।’
সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘মৃত অবস্থায় এক ব্যক্তিকে হাসপাতালে আনা হয়। তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়েছে। শরীরে বেশ কিছু কোপানোর জখম আছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।’
এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার মাহফুজ্জামান আশরাফ বলেন, ‘বিএনপি গতকাল আমাদের কাছে এসেছিল আজকের পদযাত্রার অনুমতির জন্য। আমরা তাদের শহরের গোডাউন এলাকা থেকে দক্ষিণ তেমুহনি পর্যন্ত পদযাত্রা করার অনুমতি দিয়েছিলাম। আজ উত্তর তেমুহনিতে আওয়ামী লীগের শোভাযাত্রা ছিল। আমরা বিএনপি নেতাদের বলেছিলাম, দক্ষিণ তেমুহনিতে যে ব্রিজের কাজ চলছে, এর মাঝামাঝি থাকতে। তাদেরকে হাইওয়েতে উঠতে দেওয়া হবে না এমনটাই বলা ছিল। তারা মেনেও নিয়েছিল। কিন্তু আজকে তারা হাইওয়েতে ওঠার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে।’
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘বিএনপির প্রত্যেকের কাছে পতাকার সঙ্গে লাঠি ছিল। পুলিশ শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করে নিবৃত করার চেষ্টা করেছে। আমাদের একটাই উদ্দেশ্য ছিল, তাদেরকে লাইন ক্রস করতে না দেওয়া এবং হাইওয়ে উঠতে বাধা দিয়েছি। কিন্তু তারা এতটাই উচ্ছৃঙ্খল হয়ে যায়, পরে আমরা লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করেছি। একজন মারা গেছে শুনেছি। তবে কীভাবে মারা গেছে, সেটা জানি না। এ সময় পুলিশের ২০-২৫ সদস্য আহত হয়েছেন।’
জেলা কৃষক দলের সভাপতি মাহবুব আলম মামুন ও সদর (পূর্ব) উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া বাবু দাবি করেন, ‘আমাদের শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা কর্মসূচিতে প্রথমে কলেজ রোড এলাকায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়েছেন। এরপর রামগতি-লক্ষ্মীপুর সড়কের আধুনিক হাসপাতালের সামনে পুলিশ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা হামলা চালান। এ সময় বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর গুলি ছুড়তে থাকে পুলিশ। এতে আমাদের এক কর্মী নিহত ও গুলিবিদ্ধসহ আহত হন অন্তত ৫০ জন।’
জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাছিবুর রহমান বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ পদযাত্রায় বাধা দেয় পুলিশ। সেইসঙ্গে নেতাকর্মীদের ওপর গুলি চালায়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা হামলায় অংশ নেন। এ সময় সজিবকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।’
এদিন রাত ৯টার দিকে শহীদ উদ্দিন চৌধুরী তার বাসভবনে ব্রিফিং করে বলেন, ‘পথযাত্রা কর্মসূচির কারণে দুপুর থেকেই শহরের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নেন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তারা রাজনীতিকে রক্তাক্ত করতে সজিবকে কুপিয়ে হত্যা করেছেন। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারের দাবি জানাই।’