জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আলোচিত সদস্য মো. মতিউর রহমান রবিবার কোনও একসময় আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন বলে যে গুঞ্জন উঠেছে, সেটিকে গুজব বলছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সোমবার (২৪ জুন) বিকালে আখাউড়া ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের ইনচার্জ মো. খায়রুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটি গুজব ছাড়া কিছুই নয়। আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে মতিউর রহমান বিদেশে গেলে অবশ্যই তা আমাদের নজরে আসতো। কারণ যেহেতু তিনি ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা এবং সচিব পদমর্যাদার সেহেতু তার লাল পাসপোর্ট থাকতো। গত দুই দিনে এমন পাসপোর্টধারী কোনও ব্যক্তি আখাউড়া দিয়ে বিদেশে যাননি। গেলে অবশ্যই আমরা জানতাম। এই জাতীয় পাসপোর্টধারীর ক্ষেত্রে আমরা চেকপোস্টে অনেক সতর্কতা অবলম্বন করে থাকি। তার বিদেশ যাওয়ার রেকর্ড ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট কার্যালয়ে নেই। কাজেই বলতে পারি এটি কেবল গুজব।’
একই বিষয়ে জানতে চাইলে আখাউড়া স্থলবন্দরের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও কাস্টমসের পরিদর্শক আব্দুল কাইয়ুম তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এনবিআর সদস্য মতিউর রহমানের দেশত্যাগের বিষয়ে আমরা এখনও নিশ্চিত হতে পারিনি। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে শুনেছি, আখাউড়া দিয়ে বিদেশে পালিয়ে গেছেন। এই খবর শোনার পর থেকে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আখাউড়া ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট ও ভারতের ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ আমাদের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেননি যে, তিনি আখাউড়া দিয়ে ভারতে গেছেন।’
তবে আখাউড়া ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছে, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা না থাকলে যে কেউ বৈধ পাসপোর্ট নিয়ে দেশের যেকোনও বন্দর দিয়ে অন্য দেশে যেতে পারেন। মতিউর রহমানের পাসপোর্ট নম্বর পাওয়া গেলে নিশ্চিত হওয়া যেতো, তিনি কোন বন্দর দিয়ে দেশত্যাগ করেছেন নাকি দেশেই আছেন।
তবে কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রকাশিত সংবাদের তথ্যমতে, ছাগলকাণ্ডে আলোচনায় আসার পর থেকে মতিউর রহমানের হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না। তার বিভিন্ন বাসভবনে খোঁজ নিয়েও সন্ধান মেলেনি। এমনকি কোরবানির ঈদের ছুটির পর অফিস খুললেও অফিসে আসেননি। এ সময়ে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি সেরেছেন। রবিবার (২৩ জুন) বিকালে ‘মাথা ন্যাড়া’ করে আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন।
এদিকে, মতিউর রহমান, তার স্ত্রী লায়লা কানিজ ও ছেলে আহমদ তৌফিকুর রহমানের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত। সোমবার সকালে ঢাকা মহানগরের সিনিয়র বিশেষ জজ মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন এ আদেশ দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেন দুর্নীতি দমন কমিশনের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মীর আহমেদ আলী সালাম। তিনি বলেন, ‘মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। মতিউর ও তার পরিবারের সদস্যরা বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এজন্য বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আদালতে আবেদন করে দুদক। আদালত আবেদন মঞ্জুর করেছেন।’
এবার পবিত্র ঈদুল আজহার সময় মতিউর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রীর ছেলে মুশফিকুর রহমান ১৫ লাখ টাকার ছাগল কিনতে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসেন। ছেলের বিলাসী জীবনযাপনের সূত্র ধরেই মতিউরের সম্পদের বিষয়টি আলোচনায় ওঠে আসে। মতিউর ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা একের পর এক সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসছে। দুই স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোনসহ স্বজনদের নামে ছয় জেলায় জমি, ফ্ল্যাট, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, রিসোর্টসহ নানা সম্পত্তির খোঁজ পাওয়া গেছে। এর বাইরে পুঁজিবাজারেও তার বিনিয়োগ রয়েছে। আলোচিত এই কর্মকর্তা ও তার স্বজনদের নামে থাকা এখন পর্যন্ত ৬৫ বিঘা জমি, ৮টি ফ্ল্যাট, ২টি রিসোর্ট ও পিকনিক স্পট এবং ২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্পত্তি তার প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজের নামে। তার নামে প্রায় ২৮ বিঘা জমি ও ৫টি ফ্ল্যাট রয়েছে; এর মধ্যে ঢাকার মিরপুরে একটি ভবনেই রয়েছে চারটি ফ্ল্যাট। কলেজশিক্ষক লায়লা কানিজ বর্তমানে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক।