জাটকা রক্ষা কর্মসূচি সফল করতে সরকারি তালিকাভুক্ত প্রত্যেক জেলেকে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত প্রতি মাসে ৪০ কেজি করে চাল সহায়তা দিয়ে থাকে সরকার। এ জন্য অনেক আগেই ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের কাছে চাল বরাদ্দ চাওয়া হয়। একাধিকবার তাগিদ দেওয়ার পর অবশেষে ১০ মার্চ বৃহস্পতিবার এই বরাদ্দ মিলেছে। বিষয়টি জানান জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা একেএম মজিবুর রহমান ও জেলা প্রশাসক আব্দুস সবুর মন্ডল।
কিন্তু ততদিনে ১ মার্চ থেকে গত ১০ দিনে ৬৩ জন জেলের সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড হয়ে গেছে বলে জানা যায়। সেইসঙ্গে আটজনের কাছ থেকে ৫২ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে বলেও খবর পাওয়া গেছে। এ অবস্থায় বিকল্প কর্মসংস্থানহীন বেকার জেলে ও তাদের পরিবার চরম বিপাকে পড়েছেন বলে ভুক্তভোগীরা জানান। বিষয়টি নিশ্চিত করেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সফিকুর রহমান।
সদর উপজেলার বহরিয়া এলাকার জেলে হাবিবুর রহমান বলেন, পদ্মা-মেঘনায় দুইমাস অভয়াশ্রম ঘোষণা করে সরকার, আমরা মানি। এ সময়ে সরকার চাল দেয়। কিন্তু চাল সঠিক সময়ে পাই না। সরকারের আইন মেনে আমরা নৌকা নদীতে নামাই না। এদিকে সরকার আমাদের যে ৪০ কেজি করে চাল দেয়, তা আমাদের জন্য পর্যাপ্ত না। বর্তমানে প্রতিদিন সংসার খরচ হয় ৩০০-৩৫০ টাকা। জাল করতে কিস্তি ওঠাতে হয় এক থেকে দেড় লাখ টাকা। এ সময়ে কিস্তির টাকা নিয়েও বিপদে পড়তে হয়। আমাদের দাবি, সরকার ঠিক সময়ে চাল দেবে এবং এর সঙ্গে কিছু টাকাও দেবে। তাহলেই আমরা মোটামুটি চলতে পারবো।
হাইমচর উপজেলার জেলে হাকিম বলেন, সরকারিভাবে ৪০ কেজি চাল দেওয়ার কথা থাকলেও বিগত বছরগুলোতে আমাদের কম দেওয়া হয়েছে। গত বছর ২০-২৫ কেজি করে চাল আমরা পেয়েছি।
এদিকে জেলেদের চাল বরাদ্দের পাশাপাশি মেলেনি জাটকা সংরক্ষণ অভিযান পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দটিও, এমনটাই জানা যায়। সেক্ষেত্রে অভিযান পরিচালনায় ক্ষেত্রে বিপাকে পড়তে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।
সঠিক সময়ে সরকারি সহায়তা জেলেদের হাতে না দিতে পারলেও নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারী জেলেদের কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন বলে জানা যায় জাটকা রক্ষা টাস্কফোর্সের সভাপতি আব্দুস সবুর মন্ডল। টাস্কফোর্সের সভায় তিনি বলেন, কেউ রেহাই পাবে না। বিশেষ করে ভোর রাতে মাছ ধরার চেষ্টা করা হয়। সে ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। নদীতে যত ধরনের ইঞ্জিন চালিত মাছ ধরার নৌকা পাওয়া যাবে সেগুলো জব্দ করতে হবে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সফিকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, জেলার চার উপজেলা চাঁদপুর সদর, হাইমচর, মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিণের নদী অঞ্চলে ৪১ হাজার ৪২ জন জেলেকে মৎস্য বিভাগের আওতায় চাঁদপুরের ষাটনল থেকে চরভৈরবী ৭০ কিলোমিটার অভয়াশ্রম এলাকায় ১ মার্চ থেকে মাছ ধরতে নিষেধ করা হয়েছে। এ বিপুল সংখ্যক বেকার জেলে আগামী জুন পর্যন্ত ৬ হাজার ৫৬৬ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ চান মৎস্য বিভাগ ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের কাছে।
টাস্কফোর্সের অভিযানে ১ মার্চ থেকে গত ১০ দিনে ৭৬টি অভিযানে ৬৩ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং ৮ জনের কাছ থেকে ৫২ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে বলে যোগ করেন এ কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা একেএম মজিবুর রহমান বলেন, আমরা স্থানীয় মৎস্য বিভাগ থেকে জেলেদের পরিসংখ্যান পেয়ে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি চার মাসের চাল বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। কিন্তু দীর্ঘ দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও ওই বরাদ্দ না আসায় গত ৮ মার্চ আবারও মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠাই।
এদিকে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আব্দুস সবুর মন্ডল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বৃহস্পতিবার বিকালে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সচিব জানিয়েছেন, চাঁদপুরের বরাদ্দ মিলেছে। শিগগিরই এ বরাদ্দ চাঁদপুরে এনে জেলেদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। বর্তমান নীতিমালার আলোকে ৪০ কেজি করেই চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ৮০ কেজি চালের প্রস্তাবনা উত্থাপিত হয়েছে। অনুমোদিত হলে পরবর্তীতে হয়তো বাকিটা দেওয়া হবে।
জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য মতে, এ বছর তালিকাভুক্ত হওয়া ৯ হাজার ৭৬০ জন জেলেসহ নিবন্ধনকৃত জেলে রয়েছেন ৪১ হাজার ৪২ জন। এদের মধ্যে হাইমচর উপজেলায় ১৩ হাজার ৩৩, মতলব উত্তরে ৭ হাজার ৭২৬, মতলব দক্ষিণে ৩ হাজার ৫৯২ এবং চাঁদপুর সদর উপজেলায় ১৬ হাজার ৬৯১ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানান।
/এইচকে/