মো. আকাশ (১৮)। চট্টগ্রাম নগরীর মুরাদপুর এলাকার একটি গ্যারেজে কাজ শিখছিলেন। গত ১৬ জুলাই মুরাদপুর মোড়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ-যুবলীগের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। তার পেটের ডান পাশে গুলি লেগেছে। এরপর থেকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ক্যাজুয়ালিটি ওয়ার্ডের ৬ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন। ইতিমধ্যে তার শরীরে দুই বার অস্ত্রোপচার হয়েছে।
আকাশের বাবা গ্যারেজ মিস্ত্রি মো. এনাম। তার বাড়ি নগরীর পাঁচলাইশ থানাধীন হামজারবাগ সঙ্গীত এলাকায়।
শনিবার (২৭ জুলাই) সকালে হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, চমেক হাসপাতালের ক্যাজুয়ালিটি বিভাগের শয্যায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন আকাশ। তার পাশে বসে ছিলেন বাবা এনাম, মা পারভীন আক্তার ও বড় বোন। তিনি বলেন, ‘আমার পেটে গুলি লেগেছে। খুব কষ্ট হচ্ছে।’
তার বাবা বলেন, ‘আমার ছেলে কোনও রাজনীতি করে না। আবার ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত নয়। আমার ছেলে মুরাদপুরে একটি গ্যারেজে কাজ শিখছিলেন। ঘটনার দিন বাড়ি থেকে দুপুরে ভাত খেয়ে গ্যারেজে যাওয়ার সময় মুরাদপুরে রাস্তায় গুলিবিদ্ধ হয়। পরে তাকে স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করান।’
তিনি বলেন, ‘আমার এক ছেলে এক মেয়ের মধ্যে আকাশ ছোট। পরিবারে দুই ছেলে-মেয়ে এবং স্ত্রীসহ আমরা চার জনের পরিবার। চার জনই আমার আয়ের ওপর নির্ভরশীল। গরিব হলেও একমাত্র ছেলেকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন ছিল। অনেক আশা ছিল। আমার ছেলে আবার কখন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াতে পারবে- বলতে পারছি না।’
আকাশের মা পারভীন আক্তার কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘মুরাদপুরে মারামারি হচ্ছে জানলে ওই দিন ভাত খাওয়ার পর আর গ্যারেজে পাঠাতাম না। আমার ছেলের দুই দফা অপারেশন হয়েছে। তিন ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছে। পেটের ডান পাশে গুলি লেগেছে। সে এখনও গুলির যন্ত্রণায় ছটফট করছে। কখনও কখনও ব্যথায় চিৎকার দিয়ে কান্নাকাটি করছে। কবে নাগাদ আমার ছেলে স্বাভাবিক হবে বুঝতে পারছি না। তার চিকিৎসায় ওষুধপত্র মিলে ৩৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয়ে গেছে। আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে ধার নিয়ে ছেলেকে চিকিৎসা করাতে হচ্ছে।’
ঘটনার ১২ দিন পরও ভালোভাবে কথা বলতে পারছেন না আকাশ। তার পেটে ব্যান্ডেজে মোড়ানো। আকাশ বলেন, ‘ষোলশহরের দিক থেকে কে বা কারা আমার ওপর গুলি করেছে। প্রথমে বুঝতে পারিনি, আমার শরীরে গুলি লেগেছে। দাঁড়ানো অবস্থা থেকে এক পর্যায়ে রাস্তায় বসে পড়ি। পেটে হাত দিয়ে দেখি, হাত রক্তে লাল হয়ে গেছে। তখনও বুঝতে পারিনি আমার পেটে গুলি লেগেছে। হাসপাতালে আনার পর যখন জ্ঞান ফিরেছে তখন শুনেছি, আমার পেটে গুলি লেগেছে।’
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ক্যাজুয়ালিটি বিভাগের চিকিৎসক ডা. প্রান্ত বড়ুয়া বলেন, ‘তার পেটের ডান পাশে গুলি লেগেছে। অপারেশনের মাধ্যমে গুলি বের করা হয়েছে। তার অবস্থা আগের চেয়ে ভালো।’
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন বলেন, ‘সংঘর্ষে চমেক হাসপাতালে দুই শতাধিক ব্যক্তি ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে বর্তমানে ১০ জন চিকিৎসাধীন আছেন।’
চট্টগ্রামে গত ১৬ জুলাই নগরী মুরাদপুর এবং ১৮ জুলাই বহদ্দারহাট মোড়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ, বিজিবি, ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ছয় জন নিহত এবং আহত হন কমপক্ষে দুই শতাধিক। এর মধ্যে ৪০ জন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় চমেক হাসপাতালে ভর্তি হন। চট্টগ্রামে মারা যাওয়া ছয় জনের মধ্যে পাঁচ জনই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন।