অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া বলেছেন, ‘গত সরকার ছিল জনগণের ম্যান্ডেটহীন নতজানু সরকার। অন্য দেশের সঙ্গে যখন তারা কথা বলতো, নতজানু হয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে কথা বলতো। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, এ দেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে অন্য একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে আমরা মাথা উঁচু করে কথা বলতে চাই। আমরা জাতীয় স্বার্থের জন্য কথা বলতে চাই, দলীয় স্বার্থের জন্য না।’
ভারতকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘তারা সীমান্তে এখনও আগের সরকারের কথা ভেবে হত্যা অব্যাহত রেখেছে। তাদের আমরা জনগণের পক্ষ থেকে স্টেটমেন্ট দিতে চাই, এতদিন ভারত শুধু এ দেশের একটি দলের সঙ্গে কথা বলতো, সেটি হচ্ছে আওয়ামী লীগ। এখন এ দেশের জনগণের সঙ্গে কথা বলতে হবে। জনগণ পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্ত নেবে দেশের সরকার তা বাস্তবায়ন করবে। সুতরাং জনগণের বুকে গুলি চালিয়ে জনগণকে হত্যা করে, বাংলাদেশকে আগ্রাসনের শিকার করে যে প্র্যাকটিস তারা এতদিন করে এসেছে সেখান থেকে সরে আসতে হবে। জনগণের সাথে কথা বলতে হবে, চোখে চোখে দেখে সম্মান দিয়ে।’
মঙ্গলবার (১০ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লা টাউনহল মাঠে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।
উপদেষ্টা আসিফ মঞ্চে উঠেই বলেন, ‘যাদের জন্য আজ আমরা এখানে উপস্থিত হয়েছি, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারছি- সেসব ভাইদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। বাংলাদেশের মানুষ আসলে বেশি কিছু চায় না। মানুষ শুধু স্বাধীনভাবে তার মত প্রকাশ করতে চায়। বাংলাদেশের মানুষ অনেক বিলাসিতা চায় না। বাংলাদেশের মানুষ তিনবেলা খেয়ে সুখে শান্তিতে থাকতে চায়। একটা দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের যাঁতাকলে আমরা এমনভাবে পিষ্ট হয়েছি, ফেসবুকে একটা পোস্ট দিতে গেলেও আমাদের ভাবতে হয়েছে। গানও কবিতা বলেও জেলে যেতে হয়েছে। আজ অন্তত এতটুকু শক্তি আমাদের মুখে আছে, আমরা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছি। এখন আর দরজায় নক করতে আসছে না র্যাব, ডিবি ও পুলিশ।’
তিনি বলেন, ‘আপনারা আমাদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে চেয়েছেন, তাই আমরা গিয়েছি। যাতে আমাদের অভ্যুত্থানের স্পিরিটকে সমুন্নত রাখতে পারি এবং তা নিশ্চিত করতে পারি। কিন্তু সত্যি কথা বলতে গেলে আমাদের জায়গা আসলে রাজপথ। সচিবালয়ের ক্যাবিনেট থেকে আপনাদের মাঝে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।’
এই উপদেষ্টা বলেন, ‘আজ প্রথমবারের মতো আমি কোনও কর্মসূচিতে এলাম। শুধু ১৬ বছর না অনেকেই বলে থাকেন, গত ৫৩ বছর এ দেশের ওপরে শুধু জঞ্জাল জমা হয়েছে। আমরা সেটি খুব দ্রুতই সমাধান করার চেষ্টা করছি। কিন্তু এত বছরের জঞ্জাল এক দিনে, এক মাসে কীভাবে সমাধান করা যায় তা আমাদের জানা নেই। ইতিমধ্যে আমরা কিছু পরিবর্তন দেখতে শুরু করেছি। গত ১৬ বছরে এমন কোনও বন্যা অথবা দুর্যোগ অবস্থা দেখাতে পারবেন-ত্রাণ চুরির মতো ঘটনা ঘটেনি? এবার কিন্তু এমন ঘটনা ঘটেনি। একটা খবরও আসেনি। কেউ ত্রাণের চাল-ডাল নিজের ঘরে মজুত করার মতো ঘটনা একটাও ঘটেনি।’
প্রবাসীদের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন, তারা আমাদের দেশের অর্থনীতির সচল রেখেছেন- তাদেরকে কীভাবে এয়ারপোর্টে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। তাদের লাগেজ আটকে রেখে তাদেরকে কীভাবে কষ্ট দেওয়া হতো। এখন কি আর সেটা আছে? সরকারি অফিসগুলো জনগণকে ঘোরাতো ও কষ্ট দিতো। এখন কি কেউ সেই ধৃষ্টতা দেখানোর সাহস দেখাচ্ছে? আর যেন কেউ ভবিষ্যতেও দেখানোর সাহস না দেখায়। সেটি নিশ্চিত করার জন্য আমরা কাঠামোগত সংস্কারের কথা বলছি। সেই কাঠামোগত সংস্কার কীভাবে হবে- সেটি আমরা যারা ২১ জন সরকারে আছি, তারা নির্ধারণ করবো না নির্ধারণ করবেন আপনারা। এই কথাগুলো শোনার জন্যই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনসহ যত প্লাটফর্ম আছে সবাই সারা দেশের ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে। তাদের বক্তব্য যখন আমাদের কাছে এসে পৌঁছাবে তখন আমরা বুঝতে পারবো দেশ গঠনে জনগণের রূপরেখা কী? আগামীর বাংলাদেশ তৈরি হবে জনগণের রূপরেখায়।’
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘এ ধরনের অনেক বক্তব্য আছে ছাত্র রাজনীতি করবে কিনা? আমি বলবো রাজনীতি করা না করা মানুষের ব্যক্তিগত অধিকারের প্রশ্ন। কিন্তু রাজনৈতিক সচেতনতা থাকা জরুরি। আমরা দীর্ঘ সময় শোষিত হয়েছি, শুধুমাত্র রাজনৈতিক সচেতনতা না থাকায়। আমরা শাসিত হয়েছি, কারণ আমরা পাঁচ আগস্টের মতো ঐক্যবদ্ধ হতে পারিনি। আমাদেরকে ওদের বিরুদ্ধে কখনো কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘শহীদের তালিকা করা হচ্ছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো, আমাদের যতজন শহীদ হয়েছেন সবাইকে খুঁজে বের করে তালিকা প্রকাশ করতে।’
সভায় বক্তব্য রাখেন- সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক রুবেল হোসাইন, বুয়েটের সমন্বয়ক মাহফুজ খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবদুল কাদের, মৃয়ন মনি, মাহি কাজওয়াল ওহি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া উদ্দিন অয়ন, কাজী বুলবুল আহমেদ ও ইয়াছিন আরাফাত হিমুসহ কেন্দ্রীয় সদস্যবৃন্দ।