চট্টগ্রাম ওয়াসার আয়ের একমাত্র উৎস হচ্ছে পানি বিক্রি। এ পানির ক্রেতা নগরীর ৮৬ হাজার ৩০৯ জন গ্রাহক। অথচ এসব গ্রাহকের পানির মিটারের রিডিং দেখে বিল লেখা এবং বিলের কাগজ পৌঁছানোর জন্য মিটার রিডার পদে কর্মরত আছেন চার নারীসহ মাত্র ৩৮ জন। অর্থাৎ দুই হাজার ২৭১ জন গ্রাহকের বিপরীতে আছেন একজন করে মিটার রিডার। যে কারণে ওয়াসার বিলে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনেক মিটার রিডারের বিরুদ্ধেও আছে বিস্তর অভিযোগ। এমনকি, কোনও কোনও ক্ষেত্রে বিল কম দেখিয়ে গ্রাহক থেকে আর্থিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
নগরীর দিদার মার্কেট এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মিটার রিডাররা মিটার না দেখেই প্রতিমাসে গড়ে বিল করছেন। এ কারণে আমাদের মতো কম পানি ব্যবহারকারী গ্রাহকদের বাড়তি বিলের বোঝা টানতে হচ্ছে।’
একই অভিযোগ নগরীর হামজারবাগ এলাকার বাসিন্দা আবদুল মুবিনের। তিনি বলেন, ‘পানি ব্যবহার করলে যে বিল আসে, না করলেও একই বিল আসে। এতে করে পানি কম ব্যবহারকারী গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও লাভবান হচ্ছেন বাণিজ্যিক কলকারখানায় পানি ব্যবহারকারীরা।’
চট্টগ্রাম ওয়াসা সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে ওয়াসার সংযোগ আছে ৮৬ হাজার ৩০৯টি। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক সংখ্যা ৭৮ হাজার ৫৪২ ও বাণিজ্যিক সংযোগ ৭ হাজার ৭৬৭টি। নগরের প্রায় এক হাজার ২০০ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে এ পানি সরবরাহ করা হয়।
বর্তমানে আবাসিক বাসাবাড়ির গ্রাহকরা এক হাজার লিটার পানি পাচ্ছেন ১৮ টাকায়। বাণিজ্যিক বা অনাবাসিকে গ্রাহকরা একই পরিমাণ পানির জন্য ওয়াসাকে দিচ্ছেন ৩৭ টাকা।
চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন দে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম ওয়াসায় প্রতিমাসে ২০ কোটি টাকার মতো বিল হয়। বর্তমানে ওয়াসার বিভিন্ন প্রকল্পে পানির উৎপাদন সক্ষমতা আছে প্রায় ৫৭ কোটি লিটার। এর মধ্যে ২৯ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত পানির সিস্টেম লস রয়েছে। প্রতিমাসে ৫ থেকে ৬ কোটি টাকার পানি সিস্টেম লস হচ্ছে। পানির বিতরণ লাইনে ফুটোসহ নানা কারণে এসব পানির অপচয় হচ্ছে। তবে আমাদের লক্ষ্য সিস্টেম লস ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওয়াসায় মিটার রিডারের পদ আছে ৫১টি। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ৩৮ জন। আগামী কিছুদিনের মধ্যে ওয়াসায় যুক্ত হবে ভান্ডালজুড়ি পানি সরবরাহ প্রকল্প। এ প্রকল্প থেকে দৈনিক ৬ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করার টার্গেট রয়েছে। প্রকল্পটি চালু হলে ওয়াসায় গ্রাহক সংখ্যা আরও বাড়বে। মিটার রিডারের পদে নতুন নিয়োগ না হলে চরম সমস্যার মধ্যে পড়তে হবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক দশকের মধ্যে মিটার রিডার পদে কোনও জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। সহকারী পাম্প অপারেটর থেকে ডেপুটেশনে লোক দিয়ে মিটার রিডারের কাজ করানো হয়। পরে তারা স্থায়ী হওয়ার জন্য নতুন লোক নিয়োগে সিবিএর মাধ্যমে বাধার সৃষ্টি করে। ফলে কয়েকবার লোক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়েও মিটার রিডার নিয়োগ করা যায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মিটার রিডার জানান, সীমিত জনবল দিয়ে এতগুলো সংযোগের মিটার থেকে রিডিং সংগ্রহ সম্ভব হচ্ছে না। প্রথমবার রিডিং সংগ্রহ করার পর দ্বিতীয়বার গিয়ে বিলের কাগজ দিয়ে আসতে হয়। এক্ষেত্রে কোনও কোনও গ্রাহককে অনুমাননির্ভর রিডিং দেখিয়ে বিল দেওয়া হয়।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম ওয়াসায় মিটার রিডার আছেন মাত্র ৩৮ জন। তার মধ্যে চার জন নারীও আছেন। ওয়াসায় যে পরিমাণ গ্রাহক আছে এতে একজন মিটার রিডারকে দুই হাজার ২৭১ জন গ্রাহকের মিটার দেখতে হয়। প্রথমবার রিডিং লিখে আনার পর দ্বিতীয়বার বিলের কাগজ দিয়ে আসতে হয়। জনবল সংকটের কারণে এ সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।’