সম্প্রতি রাঙামাটিতে ঘটে যাওয়া ঘটনার পর সাধারণ মানুষের মাঝে শান্তি ফেরাতে সম্প্রীতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। রবিবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকালে জেলা প্রশাসক সম্মেলন কক্ষে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন খান, পুলিশ সুপার এস এম ফরহাদ হোসেন, সদর সেনা জোনের কমান্ডার লে. কর্নেল এরশাদ হোসেন চৌধুরী, আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কে এস মং, জেলা বিএনপির সভাপতি দীপেন তালুকদার, সিএনজি-বাস-ট্রাক শ্রমিক মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ, জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, সাংবাদিক, বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের বক্তব্য রাখেন।
গত শুক্রবার যে ঘটনা ঘটেছে সভায় এর নিন্দা জানানো হয়। বক্তারা বলেন, এই সম্প্রীতি নষ্ট করতে যারা কাজ করছে, তাদের বের করে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যদি তাদের বিচারের ব্যবস্থা করা না হয়, তাহলে এমন ঘটনা বন্ধ করা যাবে না। পূর্বের ঘটনার বিচার না হাওয়াতে এমন ঘটনা বন্ধ করা যাচ্ছে না।
এলাকাভিত্তিক শান্তি কমিটি গঠন, ক্ষতিগ্রস্ত ছোট ফল ও সবজি ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ, সিএনজি-বাস-ট্রাক হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়। একইসঙ্গে সমাবেশের ক্ষেত্রে পাহাড়িদের ডিসি অফিস পর্যন্ত রাখা এবং বাঙালিদের সমাবেশের জন্য বনরুপার প্রস্তাব করা হয়।
আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কে এস মং জানান, ‘উপদেষ্টাদের কাছ থেকে আমরা কোনও মেসেজ পেলাম না। তারা কোনও ঘটনার স্থান পরিদর্শন করেননি। আঞ্চলিক পরিষদ, মসজিদ, বৌদ্ধ বিহারের ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা পরিদর্শন করতো- এতে দেশের মানুষ, পাহাড়ের মানুষ একটা মেসেজ পেত।’
তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রীতি মিছিল করতে হলে জেলা পরিষদ প্রতিনিধি, আঞ্চলিক প্রতিনিধিদের সংযুক্ত করুন। আমরা সবাই অধৈর্য হয়ে গেছি। মশাল মিছিল থেকে এই প্রোগ্রামের প্রস্তুতি থাকলেও আপনারা কেন ব্যবস্থা নিলেন না? পাহাড়ে কিছু হলেই পাহাড়ি-বাঙালি হামলা, দাঙ্গা হয়ে যাচ্ছে, আমাদের মধ্যে মনুষ্যত্ব কি এতই বিলুপ্ত হয়ে গেছে? আমরা সম্মিলিতভাবে এটাকে মোকাবিলা করতে চাই।’
পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে হওয়া সংঘর্ষের বিষয়ে সদর সেনা জোনের কমান্ডার লে. কর্নেল এরশাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘যারা এই অনুষ্ঠানটি করবে তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছিল, কিছু হবে না। ঘটনার পর মনে হচ্ছিল, এটি পরিকল্পনা। সবদিক মিলিয়ে এমন পরিস্থিতি ছিল, আমি চিন্তা করতে পারিনি। চেষ্টা করেছি, সব দিক দেখার। শুরুতে বিক্ষোভকারীদের কারণে মূল শহরে ঢুকতে সময় লেগেছে। দ্রুত আসামবস্তি এলাকা ঘুরে বনরুপায় আসি। দুই বিক্ষোভকারীদের আলাদা করি। এ সময় বিভিন্ন স্থানে আগুনের ঘটনা ঘটে। আগুন নেভাতে সহযোগিতার চেষ্টা করেছি। অনেক আহতকে হাসপাতালে নিয়ে গেছি, অনেক লোকজনকে উদ্ধার করে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।’
পুলিশ সুপার এস এম ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের অনেক গাড়িতে হামলা করে। পুলিশ বক্স ভেঙে দিয়েছে। আমরা ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করেছি। এই ঘটনায় বিভিন্ন জায়গা থেকে ফেসবুকে উসকানি দেওয়া হয়েছে। যারা এসব কাজ করেছে তাদেও বিচারের আওতায় আনা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। তদন্তের কাজ চলছে। যারাই দোষী তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা হত্যা মামলা করেছি। যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সিসিটিভি স্থাপন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।’
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন খান বলেন, ‘এই ঘটনায় একজন নিহত ও ৬০ জন আহত অবস্থায় রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। আজ সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। তদন্ত কমিটি ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কাজ শুরু হয়েছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সবাই মিলে কাজ করতে হবে। এমন ঘটনা আর যাতে না হয়, সেদিকে সবাইকে সচেতন হতে হবে।’
সভা হওয়া সিদ্ধান্তের বিষয়ে জেলা প্রশাসক জানান, প্রত্যেকে এলাকায় সব সম্প্রদায়ের মানুষ নিয়ে শান্তি কমিটি গঠন, শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে শান্তি সমাবেশ করা। বনরুপায় সেনা ক্যাম্প স্থাপনের জন্য সদর জোন কমান্ডার বিষয়টি দেখবেন। আইনশৃঙ্খলা কমিটি পুনর্গঠন করা, ফেসবুকে গুজব ছড়ানো ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হবে। জেলা প্রশাসকের প্রধান ফটকের সামনে সমাবেশ বন্ধ।
তিনি বলেন, সড়ক দখল করে কোনও সভা-সমাবেশ করা যাবে না। সমাবেশ করতে হলে জিমনেশিয়াম অথবা পৌরসভায় করতে হবে। বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তার, শহরে সিসিটিভি স্থাপনেরর বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় খাগড়াছড়ি সদরে মামুন নামে এক ব্যক্তির লাশ পাওয়াকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। ১৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় অনেক বাড়ি ও দোকানপাটে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষোভকারীরা। সংঘর্ষে তিন জন নিহত হন।