‘শাহাদাত বলেছিল আমাকে আর বেশিদিন কষ্ট করতে হবে না। মানুষের বাড়িতে কাজ করতে হবে না। আমরা সবাই মিলে সুখে-শান্তিতে থাকবো। কিন্তু সে কথা রাখার আগেই ছেলেকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। কী অপরাধ ছিল। কোন কারণে আমার ছেলেটাকে পিটিয়ে হত্যা করা হলো।’
সোমবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বিকালে চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানাধীন বিআরটিসি এলাকার বয়লার কলোনির বস্তিতে কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলেছেন নিহত শাহাদাত হোসেনের মা দিলোয়ারা বেগম। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে কী নিষ্ঠুর ও নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে তারা। আমার ছেলে কী এমন অপরাধ করেছিল। যে কারণে এমন নৃশংসভাবে হত্যা করতে হবে? ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনার জন্য প্রশাসনের প্রতি দাবি জানাই।’
নিহত শাহাদাত হোসেন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থানার পাঁচবাড়িয়া ইউনিয়নের নদনা গ্রামের মিয়া জান ভূঁইয়া বাড়ির মৃত মোহাম্মদ হারুনের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে স্ত্রী ও মাকে নিয়ে বিআরটিসি এলাকার বয়লার কলোনিতে থাকতেন। গত ১৪ আগস্ট নগরের আখতারুজ্জামান উড়াল সেতুর নিচে ২ নম্বর গেট মোড় এলাকায় দুটি খুঁটির সঙ্গে দুই হাত বেঁধে ‘মধু হই হই আরে বিষ হাওয়াইলা’ গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নেচে-গেয়ে শাহাদাতকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে একদল যুবক। গত শনিবার পিটিয়ে হত্যার ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ২০ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, দুটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। এ সময় গান গেয়ে তাকে মারধর করছেন যুবকরা। ভিডিওটিতে মারধরের শিকার ব্যক্তি যে শাহাদাত, সেটি শনিবার রাতে পুলিশকে নিশ্চিত করেছেন স্ত্রী শারমিন আক্তার। শাহাদাত পেশায় ছিলেন ভ্যানচালক।
সোমবার বিকালে বয়লার কলোনিতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে এক কক্ষের একটি ঘরের দরজায় বসে কাঁদছিলেন দিলোয়ারা বেগম। ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘সাগর নামে শাহাদাতের পুরোনো এক বন্ধু আছে। তাকে কিছু টাকা ধার দিয়েছিল শাহাদাত। সেদিন সাগরের ফোন পেয়ে পাওনা টাকা আনার জন্যই দুপুরে বের হয়েছিল। সন্ধ্যা থেকে মোবাইল বন্ধ ছিল। পরদিন লাশ উদ্ধারের খবর পাই।’
শাহাদাতের স্ত্রী শারমিন আক্তার বলেন, ‘দুই বছর আগে আমাদের বিয়ে হয়েছে। এখন আমি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এই সময় স্বামীকে হারালাম। আমার স্বামীকে যারা মারলো, আমি তাদের বিচার চাই।’
কারা হত্যা করেছে জানতে পেরেছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে শারমিন বলেন, ‘সেদিন দুপুরে সাগরের ফোন পেয়েই বাসা থেকে বের হয়েছিল শাহাদাত। সাগর আমাকেও মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে। আমি বর্তমানে স্বামীর বাসায় থাকছি না।’ ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে সাগর আছে কিনা এমন প্রশ্নে শারমিন সরাসরি জবাব দিতে রাজি হননি। তবে সাগর ওই স্থানের আশপাশে প্রায়ই থাকতেন বলে জানান তিনি।
পুলিশ জানায়, গত ১৩ আগস্ট সন্ধ্যা কিংবা ১৪ আগস্ট রাতে মারধরের ঘটনাটি ঘটে। তবে লাশ ১৪ আগস্ট উদ্ধার হওয়ায় পুলিশের ধারণা ওই দিন ঘটনাটি ঘটেছে। সেদিন শাহাদাতের স্ত্রী ও চাচা মো. হারুন হাসপাতালে গিয়ে তার লাশ শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় নিহতের চাচা হারুন ১৫ আগস্ট অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ১৩ আগস্ট বেলা ২টার দিকে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হন শাহাদাত। সন্ধ্যা ৭টার দিকে ফোন করলে কিছুক্ষণের মধ্যে বাসায় চলে আসবেন বলে স্ত্রীকে জানান। গভীর রাত পর্যন্ত বাসায় ফিরে না আসায় খোঁজাখুঁজি করেন শারমিন। এ সময় শাহাদাতের মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। ১৪ আগস্ট রাত সাড়ে ৯টার দিকে ফেসবুকে বাদী হারুন দেখতে পান, নগরের প্রবর্তক মোড়ের অদূরে সিএসসিআর হাসপাতালের সামনের সড়কের পাশে ভাতিজা শাহাদাতের লাশ পড়ে আছে।
এর আগে রাত ৯টার দিকে খবর পেয়ে পাঁচলাইশ থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের (চমেক) জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। ওই দিন রাতেই চমেক হাসপাতালে গিয়ে পুলিশের উপস্থিতিতে শাহাদাতের লাশ শনাক্ত করেন স্ত্রী শারমীন এবং মামলার বাদী হারুন। সেদিন রাতে মৃত অবস্থায় শাহাদাতকে হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন বাদী।
লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়, শাহাদাত হোসেনের মাথা, গলাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর জখমের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে গান গেয়ে গেয়ে তাকে লাঠি হাতে মারধর করতে দেখা গেছে কয়েকজন যুবককে।
নগরীর পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোলায়মান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শাহাদাতকে যেখানে মারা হয়েছে, আমরা ভাইরাল হওয়া ভিডিও দেখে তা শনাক্ত করেছি। তাকে নগরের আখতারুজ্জামান উড়ালস সেতুর নিচে ২ নম্বর গেট মোড় এলাকায় পিলারের সঙ্গে দুই হাত লম্বা করে বেঁধে পেটানোর ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।’
ভিডিও থেকে ঘটনায় জড়িত কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে জানিয়ে নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, ‘শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’
নগরীর বিআরটিসি বয়লার কলোনির বাসিন্দা নুরুল আমিন বলেন, ‘শাহাদাত পেশায় ভ্যানচালক ছিলেন। তার মা দিলোয়ারা বেগম মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করেন। স্ত্রী শারমিন অন্তঃসত্ত্বা। কারা কী কারণে শাহাদাতকে হত্যা করেছে, তা তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি আমরা।’
আরও পড়ুন: ‘মধু হই হই’ গানের তালে দুই হাত বেঁধে যুবককে পিটিয়ে হত্যা