বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা দাবি বাস্তবায়ন ও মাঠের নির্যাতিত ত্যাগী নেতাকর্মীদের দিয়ে জেলা বিএনপির কমিটি গঠনের দাবিতে সমাবেশ করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীরা। রবিবার (১২ জানুয়ারি) দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর মুক্তমঞ্চ ময়দানে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র হাফিজুর রহমান মোল্লা কচি বলেন, ‘হাজার-হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আজকে বাংলাদেশের নবযাত্রা সূচনা করেছে। সেই নবযাত্রাকে অনুসরণ না করে বিগত দিনে স্বৈরাচারের মতো ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে যদি আগামী ১৮ জানুয়ারি একটি মহল বিএনপির সম্মেলন করতে চায়, বিনা ভোটে তাদের নির্বাচিত করতে চায়। সেটি বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীরা মেনে নেবে না।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিএনপির ১৪টি ইউনিটে মোট ভোটার (কাউন্সিলর) ১৪১৪ জন। এর মধ্যে ৬টি ইউনিটে এখনও ভোট করতে পারে নাই বর্তমান আহ্বায়ক কমিটি। আমরা দাবি রাখছি, যতক্ষণ পর্যন্ত ১৪টি ইউনিটের ভোট পরিষ্কারভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরে না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত এখানে কোনও সম্মেলন করতে দেওয়া হবে না।’
কেন্দ্রীয় নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘বিএনপির ত্যাগী, কারা নির্যাতিত নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশকে বাদ দিয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে ভুয়া ভোটার তালিকা প্রণয়ন করে আগামী ১৮ জানুয়ারি জেলা বিএনপির কাউন্সিল করতে চায়। এটি কোনোভাবে মেনে নেবে না ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীরা। জেনে রাখবেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ যদি ক্ষেপে যায়, তাহলে রক্ষা নেই। মাননীয় নির্বাচন কমিশনার আপনাকে সম্মান দিয়ে বলছি, আপনারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সম্পর্কে জানুন। ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে আসুন, ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে দেখুন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের কথা শুনুন। ন্যায়বিচার যেটা আছে সেটা করবেন। কোথাও যদি মিস করেন, তাহলে কিন্তু আমরা আপনাকে মানবো না। এটিই আমাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।’
একইভাবে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ভিপি জহিরুল হক খোকন। তিনি বলেন, ‘আপনারা ত্যাগী নেতাকর্মীরা অনেক মামলা খেয়েছেন, অনেক জেল খেটেছেন। আমরাও বারবার জেলে গিয়েছি। অনেকের মা-বাবা জেলে থাকা অবস্থায় মারা গিয়েছেন। আজকে দুঃখ লাগছে, কাদের আমরা নেতৃত্বে দেখতে পাই। এই সমস্ত দুর্নীতিবাজদের ঝেটিয়ে দল থেকে বের করা উচিত। আজকে পাড়া-মহল্লায় তারা আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের খুঁজে, দল ভারী করার জন্য। যারা গত নির্বাচনে আমাকে পিস্তল ঠেকিয়ে হুমকি দিয়েছে, তারা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রামদা নিয়া শহরে মিছিল করেছে। ছাত্রদলের ওপর হামলা করেছে। আজকে দল ভারী করার জন্য অস্ত্রবাজদের দলে ঢোকাচ্ছেন। প্রশাসনকে আমরা বলতে চাই, এই সমস্ত অস্ত্রবাজদের কারা আশ্রয় দিচ্ছে, আপনারা কি নাকে তেল দিয়ে ঘুমান? তাদের কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে না? ভালো মানুষদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব ও কর্তব্য আপনাদের। আজকে যারা লেবাস পাল্টিয়ে বিএনপি নাম ধরে আমাদের নেতাকর্মীদের হুমকি দিচ্ছে, তারা নাকি বিএনপি নেতা। আমাদের ত্যাগী নেতাকর্মীরা তাদের সামনে দাঁড়াতে ভয় পায়।’
বর্তমান জেলা বিএনপির সদস্যসচিব সিরাজুল ইসলাম সিরাজকে উদ্দেশ করে জহির বলেন, ‘গত ৫ আগস্টের পর থেকে মামলা বাণিজ্য করে আপনি কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন? ব্যাংকে ভরেছেন, আত্মীয়স্বজনের অ্যাকাউন্টে রেখেছেন। আল্লাহ না করুক যদি কোনও কারণে সেনাবাহিনী ক্ষমতায় আসে তাহলে আপনি আগের মতো রেহাই পাবেন না।’
তিনি আরও বলেন, কোনও অবস্থাতেই আগামী ১৮ জানুয়ারি জেলা বিএনপির এই প্রহসনের সম্মেলন মেনে নেওয়া হবে না। আমরা আমাদের নেতা তারেক রহমানের কাছে বিনীত অনুরোধ করবো, আপনি যাচাই-বাছাই করে আমাদের খোঁজখবর নিয়ে একটি পরিচ্ছন্ন ভোটার তালিকা প্রকাশ করার নির্দেশনা দিন। আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে যদি এই সমস্যার সমাধান না হয়, তাহলে আগামী ১৬ জানুয়ারি এই মুক্তমঞ্চে আবারও সমাবেশ করা হবে। প্রয়োজনে আমরণ অনশনে বসবো আমরা।’
সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন জেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি অ্যাড. শফিকুল ইসলাম, সাবেক সহসভাপতি অ্যাড. গোলাম সারোয়ার খোকন, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ বি এম মোমিনুল হক, সাবেক কোষাধ্যক্ষ জসিম উদ্দিন রিপন, সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন, পৌর বিএনপির সভাপতি নজির উদ্দিন আহমেদ, যুবদলের সভাপতি শামীম মোল্লা।
সমাবেশে জেলার ৯টি উপজেলা থেকে আগত বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন।
উল্লেখ্য, আগামী ১৮ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বর্তমান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক মো. আবুল মান্নান এবং সদস্যসচিব সিরাজুল ইসলাম সিরাজ। শহরের পাশে বিরাসার গ্যাসফিল্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এ নিয়ে শহরে মাইকিং করা হচ্ছে নিয়মিত। সম্মেলনকে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে বিএনপি দুই গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। যেকোনও মুহূর্তে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।