বাড়িতে না থাকায় রক্ষা পেলো ছোট মেয়ে

আগুনে গেলো মা-বাবার প্রাণ, হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন দুই সন্তান

চট্টগ্রামে আগুনের কালো ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে মারা গেছেন মো. ইলিয়াছ (৫০) ও তার স্ত্রী ফারভিন আক্তার (৪৫)। আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন ওই দম্পতির দুই সন্তানসহ তিন জন।

এরা হলেন- মৃত দম্পতির ছেলে সোহান (১৯) এবং মেয়ে শাহীন আক্তার (২৩)। এ ছাড়াও তাদের নিকট আত্মীয় ফয়সাল (১৯) চিকিৎসা নিচ্ছেন আইসিইউতে। তবে বাসায় না থাকায় ভাগ্যক্রমে হতাহতের হাত থেকে বেঁচে যায় ওই দম্পতির ছোট মেয়ে তাহসিন আক্তার (১৪)। এদিকে হতাহতের ঘটনায় স্বজনদের মাঝে চলছে মাতম।

চমেক হাসপাতালের আইসিইউ ২৯ নম্বর বেডে চিকিৎসা নিচ্ছেন সোহান। জ্ঞান ফিরলেও ভালোভাবে কথা বলতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘রাতে মা-বাবা ও বোন মিলে একত্রে খাবার খেয়ে প্রতিদিনের মতো ঘুমাতে যাই। সেদিন আমাদের বাসায় থাকেন আত্মীয় ফয়সালও। ভোরে ঘুম ভাঙতেই দেখি দরজায় আগুন জ্বলছে। পুরো ঘর কালো ধোঁয়া। তখন নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল। দরজায় আগুন দেখে আমরা কেউ আর ঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করিনি। মা-বাবাসহ আমরা পাঁচ জনই বাসায় টয়লেটে ঢুকে পড়ি। একপর্যায়ে টয়লেটেও ধোঁয়া বাড়তে থাকে। সেখানে কখন যেন আমরা অজ্ঞান হয়ে পড়ি। হাসপাতালে আনার পর আমার জ্ঞান ফিরেছে। শুনেছি, আমার বাবা-মা নাকি আর বেঁচে নেই।’

সোহানের খালাতো ভাই ইকবাল বলেন, ‘আমি সকাল ৭টায় খবর পেয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যাই। ফায়ার সার্ভিসের টিম আমার খালা-খালুসহ পাঁচ জনকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসে। সেখানে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে খালা ফারভিন আক্তার ও খালু ইলিয়াছকে মৃত ঘোষণা করেন। আমার দুই খালাতো ভাই-বোনসহ তিন জন বর্তমানে হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসকরা বলেছেন আহত তিন জনের অবস্থাও তেমন ভালো নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার খালা-খালুর দুই মেয়ে ও এক ছেলে। এর মধ্যে ছোট মেয়ে তাহসিন আক্তার আমাদের বাড়ি মইজ্যারটেকে ছিল। সে গত এক সপ্তাহ আগে বেড়াতে গিয়েছিল। আমাদের বাড়িতে থাকার কারণে তাহসিন হতাহতের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।’

চমেক হাসপাতালের আইসিইউর সামনে নির্বাক হয়ে বসে থাকা তাহসিনের মুখ থেকে যেন কোনও কথাই বের হচ্ছে না। চোখ বেয়ে শুধু পানিই ঝরছে। মা-বাবকে হারিয়েছে, বেঁচে যাওয়া বড় ভাই-বোন দুই জনই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।

তাহসিনের কথায়, ‘আমার বাবা পেশায় ইলেকট্রিক মেকানিক। আমার বাবাকে কাজে সাহায্য করতো ভাই সোহান। আমরা ৬ হাজার টাকা মাসিক ভাড়ায় ওই বাড়িতে থাকি।’

চমেক হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. এস খালেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একই ঘটনায় পাঁচ জনকে হাসপাতালে আনা হয়। এর মধ্যে দুইজনকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করা হয়। তিন জনকে আইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাদের ধোঁয়া ও তাপের কারণে শ্বাসনালিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে বাইরে থেকে তাদের পোড়ার ক্ষত বোঝা যাচ্ছে না। এ ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হয়।’

নগরের চন্দনপুরা ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. মোকারম হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নগরীর কোতোয়ালি থানাধীন ভলুয়ারদীঘির পশ্চিমপাড়ে জাফর সওদাগর কলোনির পাঁচটি কাঁচাঘরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সোমবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটে এ আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট প্রায় এক ঘণ্টার বেশি সময় চেষ্টা চালিয়ে সকাল ৮টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনে পাঁচটি ঘর পুড়েছে। এতে ১৫ লাখ টাকার মতো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পাশের একটি ঘর থেকে একই পরিবারের পাঁচ জনকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এর মধ্যে দুই জনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। বাকি তিন জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।’

ফায়ার সার্ভিসের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘যে ঘরগুলো পুড়ে গেছে তার বিপরীতে অপর একটি ঘর থেকে পাঁচ জনকে উদ্ধার করা হয়। তাদের ঘর আগুনে পোড়েনি। পাঁচ জনকেই ওই ঘরের টয়লেট থেকে উদ্ধার করা হয়। ধারণা করছি, আগুনের ধোঁয়া থেকে বাঁচতে সবাই টয়লেটে অবস্থান নেয়।’