ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে ২৫টি রাজনৈতিক দলের ১১৫ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর, কাস্টমস, ইপিজেড, বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনটি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। এই আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাকে ঘিরে ভোটারদের আগ্রহ ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু তৈরি হয়েছে।
গত ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া নির্বাচনি প্রচারণা শেষ হয় ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টায়। এ সময়ের মধ্যে বন্দর-পতেঙ্গা আসনের অলিগলি, আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকায় টানা গণসংযোগ চালান আমির খসরু। প্রচারণায় দলীয় নেতাকর্মীর পাশাপাশি নারী-পুরুষ ও সাধারণ ভোটারদের ধানের শীষে ভোট চাইতে দেখা গেছে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে উপনির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০০৪ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
চট্টগ্রাম জেলার পাহাড়তলী থানার উত্তর কাট্টলীতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবার নাম আলহাজ মাহমুদুন্নবী চৌধুরী ও মায়ের নাম মেহেরুন্নেসা বেগম চৌধুরী। মাহমুদুন্নবী চৌধুরী ১৯৫৪ সালের পূর্ব পাকিস্তানের আইনপরিষদ নির্বাচনে ডবলমুরিং-সীতাকুণ্ড আসন থেকে জয়লাভ করেন এবং যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করলে তিনি প্রথমে গণযোগাযোগমন্ত্রী ও পরে ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হন।
১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে হিসাববিজ্ঞানে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেন আমির খসরু। শিক্ষাজীবন শেষ করে বাবার ব্যবসায় যুক্ত হন। তিনি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠা করেন এবং চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি ও দক্ষিণ এশিয়া এক্সচেঞ্জ ফেডারেশনের প্রথম সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া চট্টগ্রামে দক্ষিণ কোরিয়ার অনারারি কনসাল, সোনালী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বাংলাদেশ শিল্প বিভাগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালের নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে বিজয়ী হয়ে আসনটি ছেড়ে দেওয়ার পর আমির খসরু ওই আসন থেকে উপনির্বাচনে বিজয়ী হন। একই আসন থেকে ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬, জুন ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন।
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সকালে নগরীর মেহেদীবাগের বাসায় কথা হয় আমির খসরুর সঙ্গে। তিনি নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচন করেন। বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনেক বছর পর দেশে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ভোটারদের মধ্যে ভোট দেওয়ার প্রবল উৎসাহ রয়েছে। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মানুষ তাদের প্রতিনিধি ফিরে পাবে, নাগরিক অধিকার ফিরে পাবে। এই আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘদিনের। এই অধিকারের জন্য মানুষকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। এখন সবাই সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের অপেক্ষায় আছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি ভালো হবে। ছোটখাটো সমস্যা এখানে-সেখানে হতে পারে। তবে সার্বিকভাবে জনগণের উচ্ছ্বাসকে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। ভোটাধিকার ও নাগরিক অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য মানুষ এতটাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে, কেউ চাইলেও এটাকে ঠেকাতে পারবে না।’
বিএনপির রাজনৈতিক ভূমিকা তুলে ধরে আমির খসরু আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের ক্রান্তিলগ্নে যখনই নির্বাচন হয়েছে, জনগণ বিএনপির পক্ষেই রায় দিয়েছে। বিএনপি সব সময় দেশকে সংকট থেকে উত্তরণে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং এগিয়ে নিয়ে গেছে। এবারও আমি স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি জনগণের আস্থা বিএনপির প্রতি। দেশের এই সংকটময় সময়ে জাতিকে উত্তরণের পথে নিয়ে আসার নেতৃত্ব আবারও বিএনপিই দেবে।’
স্থানীয় ভোটারদের বক্তব্যেও প্রতিফলিত হচ্ছে আমির খসরুর প্রতি সমর্থন। পতেঙ্গা বিজয়নগর এলাকার বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই আসনে যে কজন প্রার্থী রয়েছেন, তাদের মধ্যে আমির খসরুর জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। তাকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করার জন্য এলাকার মানুষ মুখিয়ে আছে।’
আমির খসরুর ছেলে ও ব্যবসায়ী ইসরাফিল খসরু বলেন, ‘সারা দেশে ধানের শীষের গণজোয়ার শুরু হয়েছে। মানুষ পরিবর্তনের জন্য উন্মুখ। ১২ ফেব্রুয়ারি জনগণ ধানের শীষের বিপ্লব ঘটাবে। দেশকে স্বনির্ভর করতে এবং চট্টগ্রামকে একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক রাজধানীতে রূপ দিতে মানুষ ধানের শীষে ভোট দেবে।’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৩৬ নম্বর গোসাইলডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সবুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমির খসরু এলাকায় অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা। তার গণসংযোগে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল অভূতপূর্ব। আশা করছি তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করবেন।’
চট্টগ্রাম-১১ আসনে মোট ১১ জন প্রার্থী নির্বাচন করছেন। তারা হলেন- বিএনপির আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ শফিউল আলম, জাতীয় পার্টির আবু তাহের, গণফোরামের উজ্জ্বল ভৌমিক, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) দীপা মজুমদার, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মুহাম্মদ আবু তাহের, গণঅধিকার পরিষদের মুহাম্মদ নেজাম উদ্দীন, স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর ভূঁইয়া, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. আজিজ মিয়া, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের মো. নিজামুল হক আল কাদেরী এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. নুর উদ্দিন।
এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯৫ হাজার ২৭৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৫২ হাজার ৩৩২, নারী ২ লাখ ৪২ হাজার ৯৪৩ জন এবং হিজড়া ভোটার তিন জন। ১৪৩টি ভোটকেন্দ্রের ৮৯৩টি কক্ষে ভোটগ্রহণ হবে।