দুই মাস আগে কক্সবাজারের উখিয়ার মধুরছড়া রোহিঙ্গা শিবিরে ছেলেসন্তান জন্ম দিয়েছেন ছেনো আরা বেগম। এবার ছেলের প্রথম ঈদে নতুন জামা কিনে দিতে পারেননি। গত বছর পবিত্র ঈদুল ফিতরের প্রথম দিনে চালের রুটির সঙ্গে রান্না করা গরুর মাংস খেয়েছেন। এবার তা কপালে জোটেনি। গত কয়েক বছর ধরে তার ঈদ কাটছে রোহিঙ্গা শিবিরে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে রাখাইন থেকে চলে আসা ছেনো আরার এখন ঈদের খুশি ভাগ করে নিতে হচ্ছে তার মতোই আরও অনেক রোহিঙ্গা শরণার্থীর সঙ্গে। অবশ্য ঈদের খুশি এখন তাদের অতীত জীবনের স্মৃতি। নিজ দেশ ছেড়ে শরণার্থীশিবিরে এসে তাদের ঈদ উৎসব মলিন হয়ে গেছে বলে মনে করেন তিনি। তার মতো একই অবস্থা অন্যান্য রোহিঙ্গা শিবিরের অসংখ্য শরণার্থীর।
ছোনো আরা বেগম বলেন, ‘আমার ঘরে আরও পাঁচটি মেয়েসন্তান রয়েছে। একটি মাত্র ছেলে হলো দুই মাস আগে। কোনও সন্তানকে ঈদে কিছুই কিনে দিতে পারিনি। মিয়ানমারে স্বামী আবদুল হাসিমের তিনতলা কাঠের বাড়ি ছিল। আরও ছিল তিন একর জমিতে চিংড়ি ঘের। এসব হারিয়ে ঝুপড়ি ঘরে থাকতে হচ্ছে। গত বছরের ঈদে প্রত্যেক সন্তানকে নতুন জামা দিয়েছিলাম। কিন্তু এপারে আসার পর থেকে নিয়মিত তাদের জন্য খাবার জোগাড় করতে পারছি না। কীভাবে নতুন জামা কিনে দেবো।’
টেকনাফের লেদা, উখিয়ার কুতুপালং, লম্বাশিয়া, বালুখালী ও হাকিমপাড়া রোহিঙ্গা শিবিরে দেখা গেছে, শিশুরা সকাল থেকেই মেতেছে ঈদের আনন্দে। তরুণরা নতুন পাঞ্জাবি, লুঙ্গি, টুপি পরে মসজিদের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। অতিথি আপ্যায়নে কিছু কিছু পরিবারে সেমাই, পিঠার আয়োজন দেখা গেছে। তবে কিছু রোহিঙ্গা শিবিরে শিশুদের আনন্দ চোখে পড়লেও, বড়রা ঈদের দিনটি কাটিয়েছেন বিষাদে।
শনিবার সকাল ৮টায় উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন রোহিঙ্গারা। তবে অভাব-অনটনে ঈদ উৎসবের রঙ তাদের কাছে ছিল বিবর্ণ। ঈদের জামাত শেষে মোনাজাতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। মোনাজাতে আল্লাহর কাছে নির্যাতনের বিচার চেয়ে নিজ দেশে ফেরার আকুতি জানান।
টেকনাফের মৌচনী নতুন রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা সৈয়দ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘থাকা খাওয়ার যে অবস্থা সেখানে ঈদের কথা ভাবার সুযোগই নেই। ভালো পানির ব্যবস্থা নেই। বাথরুমের সুব্যবস্থা নেই। এ পরিস্থিতিতে ঈদের দিন আর সাধারণ দিনের পার্থক্য করা যায় না। টাকার অভাবে সন্তানদের জামা কিনে দিতে পারিনি। পেটের খাবার তো সবার আগে। খাবার কিনতে পারলেই তো ঈদের আনন্দ হবে।’
রোহিঙ্গারা বলছেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে টানা নয় বছর ধরে বাংলাদেশে ঘনবসতিপূর্ণ ঝুপড়ি ঘরে বেদনার ঈদ কাটছে তাদের। আনন্দ-উৎসবের এই দিনেও স্বস্তি নেই। দুঃখ-কষ্ট, অনিশ্চয়তা আর নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। নিজ দেশ ছেড়ে এসে তাদের ঈদ উৎসব মলিন হয়ে গেছে।
তবে শিশুদের জন্য টেকনাফের লেদা-জাদিমুড়াসহ কয়েকটি জায়গায় নাগরদোলা, চড়কিসহ মিনি মেলার আয়োজন করা হয়েছে। মেলার আয়োজক নুর কামাল বলেন, ‘এই মেলা তিন দিন থাকবে। এখানে শিশুরা এসে খুব আনন্দ উপভোগ করছে।’
কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, ‘ঈদ এলেও আমাদের মধ্যে আনন্দ নেই। নিজের দেশে ঈদ উদযাপন আর আশ্রয়কেন্দ্রে ঈদ এক নয়। সেখানে আমাদের পূর্বপুরুষদের কবর রয়েছে। প্রতি ঈদে নামাজ শেষে কবর জিয়ারত করতাম, যা এখন পারি না—এর চেয়ে কষ্ট আর কী হতে পারে।’
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দায়িত্বপ্রাপ্ত ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে, ‘ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। শান্তিপূর্ণভাবে ঈদের জামাত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছি আমরা।’
২০২৫ সালের ১৪ মার্চ পবিত্র রমজান মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস কক্সবাজারের উখিয়ায় শরণার্থীশিবিরে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর সঙ্গে ইফতার করেন। ইফতার আয়োজন ঘিরে তৈরি হয়েছিল বিরাট আশাবাদ। সেই সমাবেশ থেকেই ঘোষণা আসে ২০২৬ সালের ঈদের আগেই রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে। এর মধ্যে এক বছর পেরিয়ে গেছে। ঈদ এখন দুয়ারে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে সেই প্রতিশ্রুতি এখনও অধরাই রয়ে গেছে। এই সময়ে একজনও রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।
টেকনাফের লেদা আশ্রয়শিবিরের ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘ঈদ আসলেও আমাদের মাঝে তেমন আনন্দ নেই। কারণ নিজ দেশে ঈদ উদযাপন আর ভিনদেশে ঈদ অনেক ভিন্ন। মিয়ানমারে আমাদের বাপ-দাদার কবর রয়েছে। যুগ যুগ ধরে সেখানে থাকা অবস্থায় ঈদের নামাজ শেষ করে তাদের কবর জিয়ারত করতাম। কিন্তু এখন সেটা সম্ভব হচ্ছে না। এটি আমাদের কষ্ট দেয়।’
২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নির্যাতনের মুখে পড়ে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। বর্তমানে পুরনোদেরসহ উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি শিবিরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। তাদের প্রত্যাশা একটাই, সম্মান ও নিরাপত্তা নিয়ে নিজ দেশে ফেরা।