মায়ের সঙ্গে ঈদ করতে ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরছিলেন রায়হান। ব্যবসায়িক ব্যস্ততার কারণে ঈদের আগের দিন বাড়ি ফিরতে না পারায় ঈদের দিন রাতে বাসে উঠেছিলেন। সরাসরি ঢাকা থেকে নোয়াখালীগামী কোনও বাসের সিট না পাওয়ায় চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাসে রওনা হন। কিন্তু জীবিত আর বাড়ি ফেরা হলো না। পরিবারের কাছে ফিরে এলো নিথর দেহ। তার এমন মৃত্যুতে কাঁদছেন স্বজনরা। কিছুতেই কান্না থামছে না রায়হানের মায়ের। আর ছয় মাসের সন্তান নিয়ে বাকরুদ্ধ তার স্ত্রী।
ঈদের দিন শনিবার দিবাগত রাত ২টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায় চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাসকে ধাক্কা দেয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী মেইল ট্রেন। এতে প্রাণ হারান সাত জন পুরুষ, দুই নারী, তিন শিশুসহ ১২ জন। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন অন্তত ১০ জন। হতাহতরা ছিলেন বাসের যাত্রী।
নিহতদের মধ্যে একজন মোহাম্মদ রায়হান। তিনি নোয়াখালী সদর উপজেলার চরমটুয়া ইউনিয়নের ফাজিলপুর গ্রামের মৃত মোহাম্মদ সেলিমের ছেলে। পরিবারে এক ভাই এক বোনের মধ্যে সবার বড় রায়হান। ছোটবেলা থেকে ঢাকাতে বড় হলেও ঈদ করতেন গ্রামের বাড়িতে।
ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে নিজে গড়েছেন জুতার সোলের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বছর দুয়েক আগে বাবাকে হারিয়ে পরিবারের পুরো দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। শিশুসন্তান রাহিয়া ও স্ত্রী নুসরাত আক্তার এবং মা রেহেনা বেগমেকে নিয়ে কামরাঙ্গীরচরে ভাড়া বাসায় থাকতেন। ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
এই দুর্ঘটনা পুরো পরিবারকে হতাশায় ডুবিয়ে দিলো। দুই বছর আগে স্বামী সেলিমকে হারিয়ে একমাত্র সন্তান রায়হানকে নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছিলেন মা রেহেনা বেগম। কিন্তু সেই অবলম্বনটুকু হারিয়ে দিশেহারা। ওলট-পালট হয়ে গেলো সব। আর ছয় মাসের সন্তান নিয়ে হতাশার সাগরে ডুবেছেন রায়হানের স্ত্রী।
রবিবার সন্ধ্যায় রায়হানের মরদেহ কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে বাড়িতে আনা হয়। রাত সাড়ে ৮টায় বাড়ির সামনে জানাজা শেষে দাফন করা হয়। জানাজায় বন্ধুবান্ধব ও স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন।
নিহতের স্ত্রী নুসরাত আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রায়হানের ছয় মাসের সন্তানটি এখনও জানে না তার বাবা নেই। কখনও কোলে নেবে না। বাবার আঙুল ধরে হাঁটা শেখার আগেই তাকে এতিম হতে হলো। ব্যবসা দিয়ে রায়হান আমাদের সবার জীবন সুন্দর করতে চেয়েছিল। সেই স্বপ্ন কুমিল্লার রেললাইনে মিশে গেছে।’ এ কথা বলেই স্তব্ধ হয়ে যান তিনি। নির্বাক চাহনিতে দুই চোখজুড়ে অশ্রু ঝর ঝর করে পড়ছিল।
রায়হানের মামা মো. হাজী মানিক বলেন, ‘দুই ভাইবোনের সংসারে রায়হান বড়। তার বাবা মারা গেছেন দুই বছর আগে। কামরাঙ্গীরচরে নিজে একাই জুতার ব্যবসা পরিচালনা করতো। তার মা ও স্ত্রী ঈদের তিন দিন আগে বাড়িতে এসেছেন। পরিবারের ছয় মাসের এক কন্যাসন্তান রয়েছে। রায়হান পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার জন্য ওই দিন রাতে রওনা হয়েছিল। পথিমধ্যে দুর্ঘটনা এই পরিবারের সব শেষ করে দিলো।’
রায়হানের চাচা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘মা ও স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকাতেই থাকতো রায়হান। যানজটের কথা চিন্তা করে ২৮ রমজানে মা ও স্ত্রীকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল। রায়হান ঈদের দিন ছিল ঢাকায়। রাতে নোয়াখালীতে আসতেছিল। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষ ব্যক্তি ছিল। তাকে হারিয়ে মা ও স্ত্রী-সন্তান এখন দিশেহারা।’