বরাদ্দ না থাকায় চাঁদপুরে সরকারি তালিকাভুক্ত হয়েও সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত সাড়ে পাঁচ হাজার ইলিশ জেলে। এ ছাড়া নিবন্ধনের বাইরে থাকায় আরও কয়েক হাজার জেলে সরকারি সহায়তা পান না। এতে চরম বিপাকে আছে জেলে পরিবারগুলো। ধারদেনা আর ঋণ নিয়ে কোনোমতে চলছে তাদের জীবন।
একাধিক জেলে জানিয়েছেন, সরকারি সহায়তা বঞ্চিত হয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন চলছে তাদের। প্রকৃত এসব জেলে সরকারি নিবন্ধন তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও খাদ্য সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। বিশেষ করে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময়ে তাদের একপ্রকার না খেয়ে থাকতে হয়। দুঃখ-কষ্টে জীবন চালাতে হয়।
হাইমচরের জেলে জহির উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই নদীতে মাছ ধরি। জেলে তালিকায় আমার নামও আছে। কিন্তু আমার নামে নাকি সরকারি চাল আসে না। যখন ইউনিয়ন পরিষদের চাল বিতরণ হয় তখন সেখানে গিয়ে দাঁড়ালে দয়া করে মাঝেমধ্যে কিছু দেয়। এই দিয়ে তো আর সংসার চলে না। সংসার চালাতে মাঝেমধ্যে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরতে হয়, আবার এনজিও থেকে ঋণও নিতে হয়।’
একই কষ্টের কথা জানিয়েছেন পুরান বাজারের জেলে মোহাম্মদ রফিক। তিনি বলেন, ‘দুই মাস নদীতে মাছ ধরা বন্ধ থাকে। অন্য কোনও কাজও করতে পারি না। তবুও আমরা সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে নদীতে যাচ্ছি না। এখন স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। সরকার থেকে ৪০ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয় ৩০-৩৫ কেজি। এই সামান্য সহযোগিতা দিয়ে সংসার চলে না। অনেক জেলে আছে কিছুই পায় না। তাই সরকারের কাছে দাবি, সব জেলেকে খাদ্য ও আর্থিক সহযোগিতা বাড়িয়ে দেওয়া হোক।’
কয়েক যুগ মাছ ধরেও সরকারি তালিকায় নাম উঠাতে ব্যর্থ বহু জেলে
পুরান বাজারের মেঘনাপাড়ের বাসিন্দা রশিদ বরকন্দাজ, রুবেল বরকন্দাজ, রাসেল বরকন্দাজ, দুলাল শেখ, সোহেল হাওলাদার, খোরশেদ ভূঁইয়াসহ অন্তত শতাধিক জেলে ১৫ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত নদীতে মাছ ধরলেও সরকারি তালিকায় নেই তাদের নাম। তাই নিষেধাজ্ঞার সময়ে সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত তারা।
রাসেল বরকন্দাজ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাবার হাত ধরে ছোটবেলা থেকে গত ২৫ বছর নদীতে ইলিশসহ অন্যান্য মাছ ধরি। মাছ বিক্রি করে যে টাকা আয় হয়, তা দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করে আমার মা, স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ পাঁচ সদস্যের পরিবার। কিন্তু ইলিশের পোনা জাটকা সংরক্ষণের জন্য মার্চ ও এপ্রিল দুই মাস চাঁদপুরের মতলব উত্তরের ষাটনল থেকে হাইমচরের চর ভৈরবী পর্যন্ত মেঘনার ৭০ কিলোমিটার এলাকায় জাল ফেলা ও মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় বেকার হয়ে পড়ে বসে থাকতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘জেলে কার্ডের জন্য অনেকের কাছে ঘুরেছি, টাকা-পয়সা দিয়েছি। কিন্তু সরকারি তালিকায় নাম উঠাতে পারি নাই। তাই সরকার থেকে যে চাল দেওয়া হয়, তা আমি পাই না। অথচ এলাকার গাড়িচালক, ব্যবসা করে এমন লোকজনের নাম তালিকায় উঠেছে। তারা সরকারি সহযোগিতা পায়। আমরা পাই না।’
খোরশেদ ভূঁইয়া বলেন, ‘মৎস্য অফিসে কয়েকবার গিয়ে কাগজ জমা দিয়েছি। কিন্তু তালিকায় নাম উঠেনি। কখনও সরকার থেকে কোনও সুযোগ-সুবিধা পাইনি। এ কারণে নিষেধাজ্ঞার সময়ে ধারদেনা ও ঋণ করে সংসার চালাতে হয়। আমার মতো শত শত জেলে ধারদেনা আর এনজিওর ঋণে জর্জরিত। কিস্তির টাকা দেওয়ার ভয়ে পালিয়ে থাকতে হয়।’
একই সংকটের কথা জানালেন হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী এলাকার জেলে মানিক দেওয়ান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সুদের ওপর টাকা ও কিস্তি নিয়ে আমাদের সংসার চালাতে হচ্ছে। সরকার থেকে ৪০ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা থাকলেও বেশিরভাগ সময় ২৫ থেকে ৩০ কেজি দেওয়া হয়।’
জেলা মৎস্য বিভাগ বলছে, জাটকা সংরক্ষণের জন্য মার্চ-এপ্রিল দুই মাস নদীতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় নিবন্ধিত জেলেদের চার মাস ৪০ কেজি করে চার কিস্তিতে মোট ১৬০ কেজি চাল সহয়তা দেয় সরকার। জেলার নিবন্ধিত ৪৫ হাজার ইলিশ জেলের বিপরীতে চাল সহায়তা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩৯ হাজার ৪০০ জনকে। মার্চ মাসজুড়ে দুই কিস্তির চাল বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিগত বছরগুলোতে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য গরু, ছাগল দেওয়া হলেও এবার তা দেওয়া হচ্ছে না। কারণ বরাদ্দ নেই।
চাঁদপুর সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি সব জেলেকে সরকারি সহায়তা দেওয়ার জন্য। যে চাল বরাদ্দ পাওয়া যায়, তা জেলেদের মাঝে বিতরণ করা হয়। মাঝেমধ্যে কম বরাদ্দ পাওয়া যায়, এজন্য সবাইকে দেওয়া সম্ভব হয় না।’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা যা বরাদ্দ পাই তাই বিতরণ করি। নিবন্ধিত জেলেদের বিপরীতে শতভাগ বরাদ্দ না পেলে আমরা কী করবো? জেলেদের জন্য ধীরে ধীরে বরাদ্দ বাড়ছে। চাল সহায়তা ছাড়াও ইলিশ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আট হাজার জেলেকে তেল, ডালসহ বিভিন্ন উপকরণ দেওয়া হচ্ছে। তবে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ইলিশ জেলেকে কিছুই দেওয়া সম্ভব হয়নি। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি। সরকার সহযোগিতা বাড়ালে তালিকাভুক্তি সাপেক্ষে তারাও পাবেন। পাশাপাশি জেলে তালিকা হালনাগাদকরণ প্রক্রিয়া চলমান আছে। পেশা বদলের কারণে অনেকে বাদ পড়েন আবার অনেকে যুক্ত হন। যারা এখনও যুক্ত হননি, নতুন তালিকায় যুক্ত করা হবে।’