ঈদুল আজহার ছুটিতে দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে চট্টগ্রামের বিনোদন কেন্দ্রগুলো। ঈদের পরদিন থেকে বিনোদন কেন্দ্রগুলো দর্শনার্থীদের পদচারণায় উৎসবমুখর পরিবেশ চলছে। বিশেষ করে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত পতেঙ্গায় শুক্রবার দিনভর হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে। একই অবস্থা শনিবারও (৩০ মে)।
ঈদের দ্বিতীয় দিনের তুলনায় তৃতীয় দিনে বেশি জনসমাগম ঘটেছে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় থানা পুলিশের পাশাপাশি ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পতেঙ্গা সি-বিচে খোলা হচ্ছে তথ্য কেন্দ্র ডেস্ক ও মাতৃদুগ্ধ সেন্টার।
চট্টগ্রামের বিনোদন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত, আনোয়ারা পারকি সৈকত, কনকর্ড ফয়’স লেক অ্যামিউজমেন্ট পার্ক ও ওয়াটার পার্ক সি ওয়ার্ল্ড, ডিসি পার্ক, কর্ণফুলী টানেল, আগ্রাবাদ কর্ণফুলী শিশু পার্ক, পতেঙ্গা বাটারফ্লাই পার্ক, সীতাকুণ্ড ইকো পার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেন, গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত, মহামায়া লেক, খৈয়াছড়া ঝর্ণা ও নাপিত্তাছড়া ঝর্ণা, পতেঙ্গা নেভালসহ অন্যান্য বিনোদনকেন্দ্রগুলো।
ঈদে চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটেছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত পতেঙ্গায়। ঈদের দিন দর্শনার্থী কম হলেও দ্বিতীয় দিন (শুক্রবার) আজ তৃতীয় দিন (শনিবার) পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে হাজার হাজার দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটেছে। এ সমুদ্র সৈকতের পাশেই রয়েছে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দেশের একমাত্র টানেল। এ টানেল দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এসেছেন দর্শনার্থীরা।
পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত এলাকায় দায়িত্বরত ট্যুরিস্ট পুলিশের ইন্সপেক্টর হাসান ইমাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সৈকত। ঈদের ছুটিতে এখানে বিপুল সংখ্যক পর্যটকদের সমাগম ঘটেছে। এবার ঈদেও দর্শনার্থী বরণে আমরা প্রস্তুত। প্রথম দিন এখানে দর্শনার্থী কম এলেও দ্বিতীয় দিন ও আজ শনিবার তৃতীয় দিনে ব্যাপক জনসমাগম ঘটে।
তিনি বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তায় পুলিশ সদর দফতর থেকে বেশ কিছু নির্দেশনা এসেছে। আমরা সে অনুযায়ী কাজ করছি। টহল পুলিশের পাশাপাশি মোতায়েন আছে সাদা পোশাকের পুলিশ। বলা যায় পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত ঘিরে একাধিক স্তরে নিরাপত্তা বলয় সাজানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনও ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
চট্টগ্রামে ঈদে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দর্শনার্থী হয় চিড়িয়াখানায়। যেখানে পশু-পাখির পাশাপাশি শিশুদের বিনোদনের জন্য আছে বিভিন্ন রাইড।
চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার চিকিৎসক ও ডেপুটি কিউরেটর ডা. শাহাদাত হোসেন শুভ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঈদের দিন দর্শনার্থী কিছুটা কম হলেও দ্বিতীয় দিন থেকে ব্যাপক দর্শনার্থীর উপস্থিতি ঘটেছে। ঈদের দিন সকাল থেকে চিড়িয়াখানা খোলা আছে। ঈদের দিনে দুই হাজার দর্শনার্থী এলেও দ্বিতীয় দিনে শুক্রবার এসেছে ১০ হাজার ৭০০ জন। শনিবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত ১২ হাজার দর্শনার্থী টিকিট নিয়ে প্রবেশ করেছে। চিড়িয়াখানায় জনপ্রতি প্রবেশ টিকিট ৭০ টাকা করে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় ৬৮ প্রজাতির ৫২০টি পশু-পাখি আছে। চিড়িয়াখানা বড় করার কাজ চলছে। কাজ শেষ হলে আরও পশু-পাখি বাড়বে। ইতিমধ্যে চিড়িয়াখানায় মরিচা পড়া পশু-পাখির খাঁচাগুলো ঘষে মেজে, নতুন করে রাঙিয়ে তোলা হয়েছে। সম্প্রতি এই চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীদের জন্য পাশের কয়েকটি পাহাড় ঘিরে গড়ে উঠা ওয়াকওয়ে দর্শনার্থীদের নতুন মাত্রা দিচ্ছে। এ চিড়িয়াখানায় পশু-পাখি দেখার পাশাপাশি আছে শিশুদের জন্য দোলনাসহ বিভিন্ন বিভিন্ন রাইড।
চিড়িয়াখানার পাশেই নগরীর কনকর্ড ফয়’স লেক অ্যামিউজমেন্ট পার্ক ও ওয়াটার পার্ক সি-ওয়ার্ল্ড সেজেছে নতুন সাজে। পর্যটকদের আকর্ষণ করতে সেখানেও নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ।
চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত ৩৩৬ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত নগরীর অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র ফয়’স লেক কমপ্লেক্স, যার মধ্যে রয়েছে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার আঁকাবাঁকা লেক। অ্যামিউজমেন্ট পার্কে সাজানো হয়েছে অনেকগুলো রাইড নিয়ে। এখানেও ঈদের পরদিন থেকে ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এখানে উল্লেখযোগ্য রাইডগুলোর মধ্যে রয়েছে, সার্কাস সুইং, বাম্পার কার, ফ্যামিলি রোলার কোস্টার, ফেরিস হুইল, পাইরেট শিপ, কফিকাপ, রেড ড্রাইল্লাইড, ইয়োলো ড্রাই-স্লাইড, বাগ বইন্স ইত্যাদি। খাবার-দাবারের জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্ট। যেখানে পাওয়া যায় দেশি-বিদেশি নানা রকম খাবারের অ্যাডভেঞ্চার।
লেকের দুই পাশে রয়েছে সারি সারি পাহাড় আর হরেক রকম গাছ-গাছালি। এখানকার বিভিন্ন পাহাড়ের নামকরণ করা হয়েছে অরুণিমা, জলটুঙ্গি, গোধুলি, অস্তাচল, আকাশমণি, বনশ্রী, হিমঝুরি, আসমানি, গগণদ্বীপ উদয়ন প্রভৃতি নামে। পাহাড়ের ঠিক উপরেই আছে ফটো কর্নার। যেখানে দেখা মিলবে নানা ভঙ্গিতে হরেক রকম প্রাণীর ভাস্কর্য। লেকের গা-ঘেঁষেই তৈরি করা হয়েছে সামুদ্রিক প্রাণীদের ভাস্কর্য নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে পিকনিক স্পট অ্যাকুয়াটিক জোন।
ফয়’স লেক কনকর্ড অ্যামিউজমেন্ট পার্কের ডেপুটি ম্যানেজার (মার্কেটিং) বিশ্বজিৎ ঘোষ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ঈদের পরদিন থেকে এখানে দর্শনার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আজ তৃতীয় দিনে সকাল থেকে আরও বেশি সমাগম ঘটছে। আগে যে রাইডগুলো নষ্ট ছিল সেগুলোর সংস্কার হয়েছে। সব রাইডের সৌন্দর্য বাড়ানো হয়েছে। পার্কটাকে আরও আধুনিক করেছি। লেকে ভ্রমণের জন্য নতুন ইঞ্জিন বোট যুক্ত করা হয়েছে। পর্যটকদের জন্য কমপ্লেক্সের ভেতরে থাকা রিসোর্ট-বাংলো সংস্কার করা হয়েছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ চট্টগ্রাম রিজিয়নের পুলিশ সুপার উত্তম প্রসাদ পাঠক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঈদের যে সাত দিন বন্ধ রয়েছে, সেগুলোর জন্য আমরা বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছি। এ সময় স্বাভাবিকের তুলনায় পর্যটক আগমন বেশি হবে। ঈদের ছুটিতে বিশেষ করে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিবেচনা করে তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় সাজানো হয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশ টহলের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও দায়িত্ব পালন করছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে দেখা যায় মা-বাবার সঙ্গে আসা বাচ্চা ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যায়। এবার সেজন্য তথ্য কেন্দ্র ডেস্ক চালু করা হয়েছে। রয়েছে মাতৃদুগ্ধ সেন্টারও। পাশাপাশি বিনোদন কেন্দ্রে ছিনতাই, হয়রানি রোধে ট্যুরিস্ট পুলিশের টিম সতর্ক অবস্থায় আছে। নিরাপত্তায় পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে আছে ওয়াচ টাওয়ারও। এখন পর্যন্ত কোনও ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।