ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা জিসান মিয়া প্রধান এখনও পুলিশ পাহারায় কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। সোমবার (১৫ জুন) বিকাল ৪টা পর্যন্ত তাকে আদালতে নেওয়া হয়নি। তার শারীরিক পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদন নিয়ে বসেছেন এ বিষয়ে গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্যরা। তারা জানিয়েছেন, জিসানের শারীরিক অবস্থা ভালো এবং তিনি সুস্থ আছেন।
পুলিশ জানায়, দাউদকান্দির এক বিধবা নারীকে ধর্ষণ ও ভ্রূণ নষ্ট করার অভিযোগে করা মামলায় শিবির নেতা জিসানকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। কিন্তু তিনি নিজেকে ‘অসুস্থ দেখিয়ে’ পুলিশি হেফাজতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এ জন্য গ্রেফতার দেখানো হলেও আদালতে পাঠাতে পারেনি পুলিশ। এমন পরিস্থিতিতে জিসান অসুস্থ কিনা, সেটি জানতে চার সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সোমবার দুপুরে বোর্ডের সদস্যরা তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদন নিয়ে বসেন। তারা জানিয়েছেন, জিসানের শারীরিক অবস্থা ভালো এবং সুস্থ আছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের পুরোনো ভবনের একটি কেবিনে চিকিৎসাধীন আছেন জিসান। কেবিনের সামনে অবস্থান করছেন পুলিশ ও সাদা পোশাকে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার ছয় সদস্য।
জিসান ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এবং সংগঠনটির কুমিল্লা জেলা পশ্চিম শাখার সাবেক সভাপতি। বিকালে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জিসানের শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে করা হয়েছে। চিকিৎসকরা আমাদের জানিয়েছেন, তার সব রিপোর্ট ভালো। তিনি সুস্থ আছেন। তারপরও তিনি কথা বলছেন না, চোখ খুলছেন না।’
মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্যসচিব ও হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান মজুমদার বলেন, ‘আমরা আজকে দীর্ঘক্ষণ এ নিয়ে কাজ করেছি এবং রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ শেষে একটি প্রতিবেদন পরিচালকের কার্যালয়ে দিয়েছি। এ নিয়ে আমাদের সরাসরি কোনও মন্তব্য করার সুযোগ নেই। এ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলবেন হাসপাতালের পরিচালক। তবে আমাদের কাছে খালি চোখে যতটুকু দেখা যায়—রোগীর অবস্থা খারাপ নয়, ভালোই মনে হয়েছে। পরিচালক একদিনের ছুটিতে আছেন। তিনি এলে দেখে এবং মেডিসিন বিভাগের প্রধানের সঙ্গে কথা বলে জিসানকে ছাড়পত্র দেবেন।’
হাসপাতালের আরেক চিকিৎসক জানিয়েছেন, চার সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড আজ বেলা ১১টার দিকে পরিচালকের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে সভা করে। এরই মধ্যে চিকিৎসকরা হাসপাতালে ভর্তি জিসানের কেবিনে যান। সেখানে তারা জিসানের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। এ ছাড়া তার সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদনও পর্যালোচনা করা হয়। সব বিষয় পর্যালোচনা শেষে বোর্ড জিসানের বড় ধরনের কোনও সমস্যা খুঁজে পায়নি। জিসান সুস্থ বা ভালো আছে মর্মে বোর্ডের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। মেডিক্যাল বোর্ডের এই মতামতের ভিত্তিতে যেকোনো সময় জিসানকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘আমি একদিনের ছুটিতে ঢাকায় আছি। হাসপাতালের সহকারী পরিচালকের সঙ্গে কথা বলেন।’
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক নিশাত সুলতানা বলেন, ‘পুলিশের পাহারায় চিকিৎসাধীন ওই রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছে মেডিক্যাল বোর্ড। তারা একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। তবে সব চিকিৎসকের এখনও স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়নি। এ বিষয়ে বিস্তারিত ছুটি থেকে এসে আগামীকাল জানাবেন পরিচালক।’
এর আগে রবিবার হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে চার সদস্যবিশিষ্ট ওই মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়। বোর্ডে সভাপতি হিসেবে আছেন হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মো. হেলালুর রহমান। সদস্য হিসেবে আছেন নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মো. আবদুল্লাহ আল হাসান এবং সাইকিয়াট্রি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মো. শাহেদুল ইসলাম। আর হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান মজুমদারকে সদস্যসচিব করা হয়েছে।
এ অবস্থায় পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা কী নেওয়া হবে জানতে চাইলে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘আদালতে সোপর্দ করার জন্য চিকিৎসকদের কাছে তার শারীরিক অবস্থা জানতে চাওয়া হয়েছে। আদালত সেই নির্দেশনা দিয়েছেন। আদালতে তার শারীরিক অবস্থার বোর্ড রিপোর্ট গেলেই যদি সব ঠিক থাকে তাহলে তাকে আদালতে তোলা হবে। মেডিক্যাল বোর্ডের প্রতিবেদন আমরা এখনও হাতে পাইনি। সেটি হাতে পেলে আমরা আদালতে উপস্থাপন করবো। এরপর আদালত যদি বলে আসামিকে আদালতে হাজির করতে, তাহলে আদালতে হাজির করা হবে। আর আদালত যদি বলে জেলহাজতে প্রেরণ করার জন্য, তাহলে জেলহাজতে পাঠানো হবে। আমরা ইতোমধ্যে জিসানের সব আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছি।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘জিসান পুরোপুরি সুস্থ আছেন। কিন্তু তিনি চোখ খুলছেন না। স্বাভাবিকভাবে কথাও বলছেন না। তাই তাকে আদালতে নেওয়া যাচ্ছে না।’
দাউদকান্দি থেকে কথিত নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর শুক্রবার রাত পৌনে ১০টার দিকে লাকসাম রেলওয়ে জংশন এলাকা থেকে ‘অচেতন’ অবস্থায় জিসানকে উদ্ধার করা হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। রাতেই চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পুলিশের ভাষ্য, জিসানকে কেউ অপহরণ করেনি; তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। নির্যাতনের শিকার ওই নারীকে বিয়ে এড়াতে অপহরণের নাটক সাজিয়েছিলেন।
তাকে উদ্ধারের পর গত শুক্রবার রাতে ওই নারী বাদী হয়ে দাউদকান্দি মডেল থানায় জিসানকে প্রধান আসামি করে চার জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় ওই নারীকে একাধিকার ধর্ষণ ও ভ্রূণ নষ্টের অভিযোগ আনা হয়েছে। জিসান ছাড়া গ্রেফতার অপর তিন আসামি হলেন- সেকান্দর আলী (২৪), গোলাম রাব্বী (২৬), সজীব হাসান (২১)। তাদের সবার বাড়ি দাউদকান্দিতে। এই তিন জন জিসানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। গত শনিবার বিকালে তাদের কুমিল্লার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।