নাঈমকে পিটিয়ে থানায় নেওয়া সোর্স ৫ আগস্টের মামলায় গ্রেফতার

জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে পিটিয়ে থানায় নেওয়া এবং থানায় হেনস্তার ঘটনায় করা মামলার কোনও অগ্রগতি নেই। দুই পুলিশসহ তিন জনকে আসামি করে করা মামলায়ও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। তবে এই মামলায় সোহেল হোসেন সরকার নামে পুলিশের এক সোর্সকে আটক করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে দুই বছরের আগের করা এক মামলায়। 

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, এ ঘটনায় গঠিত তিন সদস্যের কমিটি তাদের তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। কমিটির প্রতিবেদন পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

গত শনিবার (১৩ জুন) সকালে নাঈমের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে খুলশী থানায় মামলা করেন। মামলায় খুলশী থানার এসআই মো. শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া, কনস্টেবল রাসেল চৌধুরী ও পুলিশের সোর্স সোহেল হোসেন সরকারকে আসামি করা হয়। 

মামলার এজাহারে মারধর, অপহরণের চেষ্টা ও বেআইনিভাবে আটকে রাখার বিষয় উল্লেখ করা হয়। মামলার পর পুলিশের সোর্স সোহেলকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানায় সিএমপি। বাকি দুই আসামি এসআই শফিকুল ইসলাম ও কনস্টেবল রাসেলকে খুলশী থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়। তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা খুলশী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে এখনও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

ফৌজদারি মামলা করার পরও সুনির্দিষ্ট আসামি পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী সাব্বির আলম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌‘মামলার এজাহারে থাকা দুই পুলিশ সদস্য ও ওসি; যারা ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত তাদের গ্রেফতার করা হয়নি। আমরা চাই, তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হোক। এখন পর্যন্ত শুনেছি, এই মামলায় কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। তাহলে আমরা বিচার পাবো কীভাবে।’

সোর্সকে আগস্টের মামলায় গ্রেফতার

মামলায় দুই পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি পুলিশের সোর্স সোহেল হোসেন সরকারকেও আসামি করা হয়। ক্রিকেটার নাঈম এবং তার পরিবারের চাপে সোর্স সোহেল হোসেনকে গ্রেফতার করলেও তাকে সাব্বির আলমের দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়নি। তাকে গ্রেফতারের বিষয়ে আদালতের জিআরও শাখা ও হাজতখানার তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে খুলশী থানায় করা একটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। যার (মামলা নম্বর-৬, তারিখ ১০/৯/২০২৪)। গত শনিবার সোহেল হোসেনকে এই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করে খুলশী থানা পুলিশ। পরে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরের সিএমপির দামপাড়া পুলিশ লাইনসে হামলা ও অস্ত্র-গোলাবারুদ লুটের ঘটনায় খুলশী থানায় একটি মামল দায়ের করেছিল পুলিশ। পুলিশের দায়ের করা ওই মামলায় ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। ওই মামলায় পুলিশের সোর্স সোহেল হোসেনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

এ বিষয়ে নগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কেন অভিযুক্তকে অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখানো হলো বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানার ওসি বলতে পারবেন।’

এ প্রসঙ্গে মামলার বাদী সাব্বির আলম বলেন, ‘সোর্স সোহেলকে ভিন্ন মামলায় গ্রেফতার দেখানোর বিষয়টি এ ঘটনায় গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির কাছে জানতে চেয়েছি। তারা বলেছেন, আমরা মামলা দায়ের করার আগেই নাকি সোর্স সোহেলকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছিল। এ কারণে নাকি তাকে এই মামলায় গ্রেফতার দেখানো যায়নি। তবে দুই-এক দিনের মধ্যে তদন্ত কমিটি পুলিশ কমিশনারের কাছে প্রতিবেদন দেবে জানিয়েছে। এরপর প্রতিবেদন অনুযায়ী জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে আমরা তখন প্রতিক্রিয়া জানাবো।’  

এ ব্যাপারে মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব এবং চট্টগ্রাম আদালতের প্রবীন আইনজীবী জিয়া হাবিব আহসান বলেন, ‘ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে মারধর, হেনস্তা করা গলা চেপে ধরা এগুলো ফৌজদারি অপরাধ। এ ঘটনায় যেহেতু মামলা হেয়েছে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো উচিত ছিল। অতীতে অনেক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যকে ফৌজদারি অপরাধের কারণে গ্রেফতার করা হয়েছে। যেমন- ওসি প্রদীপ দায়িত্বে থাকাকালীন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা মো. রাশেদকে হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার হন। এখানেও একই অভিযোগ। ওসি প্রদীপ হত্যা করেছেন, এখানে ক্রিকেটারকে মারতে চেয়েছেন আরেক ওসি। দুটোই ফৌজদারি অপরাধ।’

তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশের সোর্সকে গ্রেফতার করা হলেও তাকে অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখানোর বিষয়টি রহস্যজনক। যেহেতু এ ঘটনায় সুনির্দিষ্ট মামলা হয়েছে, তাকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখালে সমস্যা কোথায় ছিল। গ্রেফতার সোর্সকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এ ঘটনার প্রকৃত রহস্য উঠে আসতো।’

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, ‘এই মামলায় অভিযুক্তরা বরখাস্ত হয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ডিপার্টমেন্ট ও আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

নাঈম হাসানকে মারধর, অপহরণের চেষ্টা ও বেআইনিভাবে আটকে রাখার ঘটনায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান উপ-পুলিশ কমিশনার (পশ্চিম) মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘গঠিত তদন্ত কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। আমাদের তদন্ত কার্যক্রম চলমান আছে। আশা করছি, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে পারবো।’

ক্রিকেটার নাঈম হাসান শুক্রবার রাতে থানায় সাংবাদিকদের জানান, রাতের ফ্লাইটে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে নামেন তিনি। সেখান থেকে অটোরিকশায় বাসার উদ্দেশে রওনা হন। এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নামার সময় লালখান বাজার এলাকায় পুলিশ অটোরিকশাটিকে থামার সংকেত দেয়। এরপর চালকের কাছ থেকে গাড়ির কাগজপত্র নিয়ে নেয়। পরে গাড়ি থেকে নামিয়ে নাঈম হাসানকে লাঠি ও পাইপ দিয়ে মারধর করেন খুলশী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম ও পুলিশের সোর্স সোহেল। একপর্যায়ে একটি অটোরিকশায় করে নাঈমকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও হেনস্তা করা হয়েছে। পরে বিসিবির কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে থানা থেকে ছাড়া পান নাঈম।

এ ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত হওয়া দুই পুলিশ সদস্য হলেন- খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল মো. রাসেল চৌধুরী। এর আগের দিন রাতেই তাদের খুলশী থানা থেকে প্রত্যাহার করে সিএমপির দামপাড়া পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছিল।