চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়ায় চার বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় মনির হোসেন (৩০) নামে এক আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই রায়ে আদালত তাকে ৫০ হাজার টাকা অর্থ দণ্ড দিয়েছেন।
বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে চট্টগ্রাম মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক সৈয়দা হাফসা ঝুমা এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় মনির হোসেন আদালতে উপস্থিত ছিল।
মনির হোসেন কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ঘারঘাটা এলাকার বাসিন্দা হলেও চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া এলাকার মিয়াখাননগরে বসবাস করতো।
ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মাহমুদ-উল আলম চৌধুরী মারুফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাকলিয়ায় চার বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় অভিযুক্ত একমাত্র আসামি মনির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই রায়ে আদালত আসামিকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেন।
তিনি বলেন, আলোচিত এ মামলায় মোট ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আজ আদালত এ রায় দিয়েছেন।
এর আগে গত ২১ মে বিকালে বাকলিয়া থানার ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের নুর হোসেন চেয়ারম্যানঘাটা এলাকার বালুরমাঠসংলগ্ন একটি গুদামকক্ষে চার বছর বয়সী ওই শিশুকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা মেহেদী হাসান বাদী হয়ে বাকলিয়া থানায় মামলা করেন।
এ মামলায় তদন্ত শেষে গত ৪ জুন আদালতের প্রসিকিউশন শাখায় অভিযোগপত্র জমা দেন এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ।
গত ৯ জুন মামলার একমাত্র আসামি মনির হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) এ মামলায় যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বাকলিয়া থানার চেয়ারম্যান ঘাটা এলাকায় ওই শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর বিকালে তাকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর শিশুটির শারীরিক অবস্থা দেখে স্বজন ও স্থানীয়দের সন্দেহ হয়, সে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। পরে ঘটনাটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে বিকাল ৫টার দিকে বিক্ষুব্ধ লোকজন রাস্তায় নেমে আসেন। অভিযুক্ত যুবক মনির হোসেন স্থানীয় একটি ডেকোরেশন দোকানে কাজ করে। ঘটনার পর স্থানীয়রা অভিযুক্তের অবস্থান নিশ্চিত করে ‘বিসমিল্লাহ ম্যানশন’ নামের একটি ভবন অবরুদ্ধ করে রাখে। একপর্যায়ে তারা ভবনটির কলাপসিবল গেট ভেঙে ফেলারও চেষ্টা করে।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটিকে পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে পাঠায়। অন্যদিকে অভিযুক্তকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় বিক্ষুব্ধ জনতা পথ আটকে দেয় এবং তাকে জনতার হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানায়। এ সময় উপস্থিত লোকজন চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘বাংলাদেশে বিচার নেই। ধর্ষককে আমাদের হাতে তুলে দেন, আমরাই তার বিচার করবো।’ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুড়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। স্থানীয়দের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে রাত সাড়ে ১০টার পর এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওই সময় অভিযুক্তকে ভবন থেকে বের করে পুলিশের পোশাক পরিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার ভিড়ের মধ্য দিয়েই বাকলিয়া থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
অভিযুক্তকে থানায় নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে স্থানীয়রা। তারা পুলিশের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি অতিরিক্ত এপিবিএন সদস্য মোতায়েন করা হয়। রাত ১২টার দিকে ক্ষুব্ধ জনতার একটি দল থানা ঘেরাও করতে মূল সড়কে পৌঁছে যায়। এ সময় কয়েকটি স্থানে আগুন জ্বালানোর ঘটনাও ঘটে। পরে অভিযুক্ত মনির হোসেনের বিরুদ্ধে পরদিন শুক্রবার শিশুটির বাবা বাদী হয়ে বাকলিয়া থানায় মামলাটি করেন। ওই দিন বিকালে আদালতে হাজির করা হলে আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
বাকলিয়া থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোলাইমান জানান, ‘বাকলিয়ার আলোচিত শিশু ধর্ষণ মামলায় তদন্ত শেষ করে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও প্রতিবেদন সংগ্রহের পর অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়েছে। মামলার তদন্ত কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ, মেডিক্যাল রিপোর্ট ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে।’
ওসি বলেন, ‘সাত কার্যদিবসের মধ্যে এ মামলায় অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়েছে। এ ঘটনায় গত ২২ মে বাকলিয়া থানায় মামলা করা হয়েছিল। ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সরকারি বন্ধ ছিল। ৪ জুন আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।’