‘প্রায় ২৪ বছর আগে বাবা কামাল হোসেন আমাদের নিয়ে কুমিল্লা থেকে রায়পুর শহরে এসেছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন—আমি কষ্ট করি, তোমরা মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করবে, ভালো চাকরি করবে। আমাদের দুঃখ আর থাকবে না। কিন্তু আট বছর আগে রাস্তায় পড়ে থাকা বিদ্যুতের তারে স্পৃষ্ট হয়ে বাবা মারা গেলেন। এখন আবার মা আর তিন বোনকেও আমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হলো। তাদের নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হলো। আমি কাকে নিয়ে বাঁচবো? বাবার স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।’
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাতে কথাগুলো বলতে বলতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন জুনায়েদ ইসলাম শিফাত (১৮)। সকালে যখন লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা-গোডাউন রোড এলাকার ভাড়া বাসায় তার মা ও তিন বোনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়, তখন তিনি কর্মস্থলে ছিলেন।
শিফাত রায়পুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র। লেখাপড়ার পাশাপাশি চাকরি করেন। তার মা শাহিনুর বেগম ছিলেন গৃহিণী। বড় বোন সায়মা আক্তার (২০) ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে গত বছর এইচএসসি পাস করেন। বুধবার তিনি ঢাকা থেকে মায়ের কাছে রায়পুরে বেড়াতে এসেছিলেন। মেজো বোন নাফিসা আক্তার ইকরা (১৬) রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস একাডেমি থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। ছোট বোন সিফা আক্তার (৯) একই প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী ছিল।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ওই বাসায় ঢুকে ভ্রাম্যমাণ ফল ব্যবসায়ী অন্তর মজুমদার দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন শাহিনুর বেগম ও তার তিন মেয়েকে।
পরিবারের সবাইকে হারিয়ে শিফাত এখন নিঃসঙ্গ। তিনি বলেন, ‘আমি কী নিয়ে বাঁচব? আমার তো আর কেউ রইল না। আমাকে দেখবে কে? ছোটবেলাতেই বাবা চলে গেছেন। এরপর থেকে কষ্ট করেই বড় হয়েছি। মানুষের বাড়িতে কাজ করেছি। বোনদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম। মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে গেল। এখন চারপাশ শুধু অন্ধকার লাগে। মা আর বোনেরা নেই। বুক ফেটে কান্না আসে। মা আর আমাকে বাবা বলে ডাকবে না। রাতে বাসায় ফিরতে দেরি হলে মা বকা দিত। এখন রাত কীভাবে কাটবে? আল্লাহ কেন আমার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিলেন? অন্তর আজ কেন আমাদের বাসায় এলো? কেন মা-বোনদের কুপিয়ে মারল? আমি যদি বাসায় থাকতাম, হয়তো এমন হতো না। কার বিচার চাইবো? তাকেও (ঘাতক) তো মেরে ফেলা হলো।’
পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার দুপুরে শাহিনুর বেগম ও তার তিন মেয়ের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। পরে কুমিল্লার হোমনা গ্রামে তাদের দাফন করা হবে। গণপিটুনিতে নিহত অন্তর মজুমদারকে নোয়াখালীর সুবর্ণচর গ্রামে দাহ করা হবে।
রায়পুর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, শিফাত আট মাস ধরে তাদের প্রতিষ্ঠানে মাসিক ৮ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেন। সকালে তিনি কাজে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। সবার সহযোগিতায় লেখাপড়ার পাশাপাশি পরিবারটিও চলছিল। পরিবারের সদস্যদের এমন মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
বৃহস্পতিবার দুপুরে জেলা পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক, র্যাব ও সিআইডির সদস্যরা হাসপাতাল ও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা প্রত্যক্ষদর্শী, ভাড়াটিয়া ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন।
স্থানীয় সমাজসেবক আব্দুর রহমান তুহিন বলেন, ‘আট বছর আগে নিহত কামাল হোসেনের সন্তানরা ছিল মেধাবী। আমরা তাদের স্বপ্ন দেখিয়েছিলাম। আট বছর আগে রমজান মাসে কেরোয়া ইউনিয়নের একটি মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে বের হওয়ার পর বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে কামাল মারা যান। পরিবারটির নিজের কোনো জমিজমা বা সম্পদ নেই। তখন আমি, কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও বিত্তবানদের সহযোগিতায় প্রায় ১০ লাখ টাকা অনুদানের ব্যবস্থা করেছিলাম। এক চিকিৎসক বড় মেয়ে সায়মার মেডিক্যালে ভর্তি ও পড়াশোনার জন্য অনেক টাকা ব্যয় করেছেন। শাহিনুরকে একটি চাকরির ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। কয়েক দিন আগেও মেয়েদের নিয়ে তিনি আমার হাসপাতালে এসেছিলেন। ফোন করে বলতেন, মামা, আমার মেয়েরা খুব মেধাবী, তাদের জন্য দোয়া করবেন। একটি অসহায় পরিবারের স্বপ্নই শেষ হয়ে গেল।’
রায়পুর ও রামগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আব্দুর রাশেদ বলেন, ‘বাড়ির মালিক ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্তর মজুমদার স্ত্রীকে নিয়ে প্রায় দেড় বছর ওই বাসায় ভাড়াটিয়া ছিলেন। প্রায় এক বছর আগে তিনি বাসা ছেড়ে চলে যান। পূর্বপরিচয়ের সূত্রে তিনি সকালে সেখানে যান বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাণী নামের এক প্রতিবেশী তাকে বাসায় দেখে কারণ জানতে চাইলে অন্তর বলেন, তিনি পানির পাইপ ঠিক করতে এসেছেন। সন্দেহ হওয়ায় রাণী কলাপসিবল গেট আটকে স্থানীয়দের খবর দেন। তার এই পদক্ষেপ না থাকলে ঘটনাটি হয়তো আরও পরে উদ্ঘাটিত হতো।’
তিনি আরও বলেন, ‘তদন্ত চলছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, অন্তরের চরিত্র ভালো ছিল না। তিনি শাহিনুর বেগমকে বিরক্ত করতেন। এ কারণে বাড়িওয়ালা তাকে বাসা থেকে বের করে দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিশোধ নিতে তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারেন।’