১‌ কো‌টি টাকার ওষুধ কি‌নে কীভাবে ৪‌ কো‌টির বিল করলেন সিভিল সার্জন

এক কোটি টাকার ওষুধ কিনে পার্বত্য জেলা পরিষদ থেকে চার কোটি টাকার বিল উত্তোলন করেছেন বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শাহীন হোসাইন চৌধুরী। জুন ক্লোজিংয়ের আগে তাড়াহুড়ো করে এই বিপুল অঙ্কের বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বুধবার বেলা ১১টায় কমিটির সদস্যরা সরেজমিনে ঘটনাস্থলে এসে তদন্ত করেছেন। একইসঙ্গে সদর হাসপাতাল প‌রিদর্শন ক‌রেছেন তারা।

তদন্ত টি‌মের সদস্যরা হলেন- পার্বত্য জেলা প‌রিষ‌দের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, জেলা প‌রিবার প‌রিকল্পনা বিভা‌গের উপপ‌রিচালক ডা. লেনিন তালুকদার, পার্বত্য জেলা প‌রিষ‌দের পি এস টু চেয়ারম্যান আবুল মনসুর, নির্বাহী প্রকৌশলী পরাক্রম চাকমা এবং হিসাব ও নিরীক্ষণ কর্মকর্তা এম মুহিব্বুল হাসান। পরিদর্শনের সময় সি‌ভিল সার্জন মোহাম্মদ শাহীন হোসাইন চৌধুরী সেখা‌নে উপ‌স্থিত ছি‌লেন না।

পার্বত্য জেলা প‌রিষ‌দের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম ব‌লেন, ‘বান্দরবান সদর হাসপাতা‌লের জন্য এক কোটি টাকার ওষুধ কিনে চার কোটি উত্তোলনের যে অ‌ভি‌যোগ উঠেছে, তা তদন্তের জন্য পার্বত্য মন্ত্রণাল‌য়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন নি‌র্দেশ দি‌য়ে‌ছেন। এটি তদন্ত ক‌রে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলেছেন প্রতিমন্ত্রী। এ বিষ‌য়ে পার্বত্য জেলা প‌রিষদের চেয়ারম্যান আমা‌কে দা‌য়িত্ব দি‌য়ে‌ছেন। আমরা সি‌ভিল সার্জন‌কে জানি‌য়ে‌ছি আজ আমরা এখা‌নে এসে‌ছি আমা‌দের‌ সহ‌যো‌গিতা করার জন্য। আমরা তাকে বলেছি, এখা‌নে টেন্ডার পদ্ধ‌তি স‌ঠিক আছে কিনা, তা খ‌তি‌য়ে দেখবো এবং ওষুধসহ যেসব সামগ্রী আছে, তা স‌ঠিকভা‌বে কেনা হ‌য়ে‌ছে কিনা, তাও আমরা খতিয়ে দেখবো। কিন্তু সিভিল সার্জন সহযোগিতা করেননি, এমনকি এখানে তিনি উপস্থিত ছিলেন না। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো।’

এর আগে মঙ্গলবার (৩০ জুন) পার্বত্য জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত পত্রের মাধ্যমে পাঁচ সদ‌স্যের এ তদন্ত টিম গঠনের কথা জানানো হয়। এ সময় তদন্ত কাজে কমিটিকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার জন্য সিভিল সার্জন‌কে অনুরোধ করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এক কোটি টাকার ওষুধ কিনে চার কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে সিভিল সার্জন শাহীন হোসাইন চৌধুরীর বিরুদ্ধে। জেলা পরিষদের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, বান্দরবান সদর হাসপাতালের জন্য ওষুধ, কেমিক্যাল, যন্ত্রপাতিসহ সরঞ্জাম সরবরাহের দরপত্রে চার কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির বিরুদ্ধে। হাসপাতালের ওষুধ, অক্সিজেন, যন্ত্রপাতি ও মালামাল সরবরাহের ছয়টি ভাগে চার কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্রের গোপন রেট কোড পছন্দের ঠিকাদার‌কে সরবরাহ করে দরপত্রটি পাওয়ার জন্য এবং মালামাল সরবরাহের কাজগুলো বাগিয়ে নিতে সহযোগিতা করেছেন সিভিল সার্জনসহ দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি। টেন্ডারে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমএসএম নামে পাঁচটি এবং আলমগীর একটি কাজ বাগিয়ে নেন। প‌রে ১৩ জুন কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কার্যাদেশ মোতাবেক আগামী ৯০ দিনের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার কথা আছে।

ওষুধ সরবরাহের জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের অর্থায়নে এক কোটি ৬০ লাখ ৭২ হাজার টাকা, পার্বত্য পরিষদের অর্থায়নে ৩১ লাখ টাকা, যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ৭৪ লাখ ১৮ হাজার টাকা, কেমিক্যাল ক্রয়ে ৮০ লাখ ৩৬ হাজার টাকা, বেন্ডেজ ক্রয়ে ১৮ লাখ ৫৪ হাজার টাকা, লিলেন ক্রয়ে ১২ লাখ ৩৬ হাজার টাকা, ফার্নিচার ক্রয়ে ১২ লাখ ৩৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর বিপরীতে মাত্র এক কোটি টাকার ওষুধ কিনে বাকি তিন কোটি টাকা পার্বত্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে উত্তোলন ক‌রে নেওয়া হয়। 

টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটিতে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ডা. সানাই ত্রিপুরা। সদস্য হিসেবে রয়েছেন সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. দেবরাজ বৈদ্য, জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. উথেন ক্য, আরএমও ডা. অতনু চৌধুরী, হিসাবরক্ষক সুভাষ দাশ এবং গণপূর্ত বিভাগের একজন প্রকৌশলী। কমিটির সদস্য ও আরএমও ডা. অতনু চৌধুরী দাবি করেন, ঠিকাদার মালামাল বুঝিয়ে দিয়েছেন এবং তা রোগীদের দেওয়া হচ্ছে।