এক ‘গুজবে’ বাজার অস্থির, কৃষকদের সর্বনাশ

সরকার ভারত থেকে চাল আমদামি শুরু করছে, এমন গুজব ছড়িয়ে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মেঘনার তীরবর্তী অন্যতম বৃহৎ ধান-চালের বাজার অস্থির করে তুলেছে মিলমালিকদের সিন্ডিকেট। যার কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ধানচালের হাটে এসে ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না কৃষক ও ব্যাপারীরা। এ অবস্থায় ধান নিয়ে হাটে এসে লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। বাধ্য হয়েই কম দামে ধান বিক্রি করছেন তারা। এরই মধ্যে গুজবের বিরুদ্ধে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিভ্রান্ত না হয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বোরো মৌসুমে ৩৬ টাকা কেজি দরে ধান এবং ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে প্রতি মণ ধান সংগ্রহের দাম নির্ধারণ করে সরকার। তবে উজানে পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যায় হাওরের কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে উজানে যারা ধানের আবাদ করেছেন সেসব কৃষকেদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত মূল্যে ধানের দাম পাচ্ছেন না তারা। এর মধ্যে গুজব ছড়িয়ে ধানের দাম আরও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বিজয়নগরের কৃষক ফুল মিয়া বলেন, ‘উজানে ধান হয়েছে। কিন্তু দাম কম। ৮৫০ থেকে ১ হাজার ৫০ টাকার বেশি দাম পাওয়া যায় না। অথচ সরকার ১ হাজার ৪৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে। আবার নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে অ্যাপের মাধ্যমে ক্রয় করছে সরকার। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ক্রয় করার কথা বললেও বাস্তবে ভিন্ন। ব্যাপারীরা ধান কিনতে এসে বলে ৯০০ টাকা মণ। চিকন ধান হলে কয় ১ হাজার ১০০ টাকা।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ধানচালের হাটে এসে ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না কৃষক ও ব্যাপারীরা

নাসিরনগরের কৃষক আবু লাল বলেন, ‘ধারদেনা করে জমিতে ধান করেছি। ধান কাটতে গিয়ে শ্রমিকের যে মূল্য, তা হিসাব করলেও স্থানীয় বাজারে ধানের দাম পাওয়া যায় না। সরকার যে মূল্যে ধান কিনছে, ওই দাম বাজারে পাওয়া যায় না। সরকার আবার সবার কাছ থেকে ধান কিনছে না। ব্যাপারীরা কয় মিলমালিকরা ধান কিনে না। তারা কৃষকের কাছ থেকে কমে ধান কিনে নেয়। পরে বাজার বাড়তির সময়, তারা বিক্রি করে বেশি দামে। আর আমরা কৃষকরা সবসময় অবহেলিত। এজন্য ধানের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।’

এদিকে ভারত থেকে দেড় লাখ টন চাল আমদানি করবে করবে সরকার- এমন গুজব রটিয়ে আশুগঞ্জের ধান ও চালের বাজার অস্থির করে তুলেছে একটি চক্র। তাদের দাবি, মিলগুলোতে বিপুল পরিমাণ অবিক্রিত চাল রয়েছে। আবার চাল আমদানি হলে দাম আরও কমে যাবে। এমন গুজব ছড়িয়ে কৃষক ও ব্যাপারীদের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনছেন তারা। এমন পরিস্থিতিতে হাজার হাজার মণ ধান নিয়ে আশুগঞ্জ বাজারে এসে অনেকটাই বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও ব্যাপারীরা। এ সুযোগে কম দামে ধান কিনছেন আড়তদাররা।

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন থেকে ধান নিয়ে আসা সেলিম মিয়া বলেন, ‘নৌকায় করে ধান আনতে দেখলেই দাম কমিয়ে ফেলে মিল মালিকদের সিন্ডিকেট। গত চার দিন ধরে বসে আছি। হাওর থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা মণ দরে ধান কিনে এখন ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি। কারণ টাকা লগ্নি এনে ব্যবসা করছি। একটা নৌকা এনে বসিয়ে রাখলে দিনে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। এখানে পাঁচ দিন বসে থাকলে ৫০ হাজার টাকা খরচ হবে। বসে থেকে তো লাভ হয় না। তাই বাধ্য হয়ে কম দামেই বিক্রি করে দিচ্ছি ধান।’

ধান নিয়ে হাটে এসে লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের

একই কথা বলেছেন কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম থেকে ধান নিয়ে হাটে আসা মিলন চন্দ্র দাস। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ধান কিনে আনতেছি ১ হাজার ১৫০ টাকায়। বাজারে ৭০০ টাকা মণ বলতেছে। গত তিন দিন ধরে বসে আছি। ধান বিক্রি করতে পারছি না। আমাদের অনেক লোকসান হচ্ছে। লস দিয়েই ধান বিক্রি করছি। তবু কেউ নিচ্ছে না। সরকার ধানের দাম দিয়েছে ১ হাজার ৪৪০ টাকা। আমাদের মিলমালিকরা দিচ্ছে ৭০০ টাকা। বিপদে পড়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি আমরা।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মিল মালিকপক্ষের ব্যবসায়ী হোসেন মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাজারে বিভিন্ন ধরনের ধান আছে। সেসব ধান আমরা কিনে চাল করে বিক্রি করতে পারছি না। এদিকে শুধু ধান কিনে জমাচ্ছি। মিল সব বন্ধ হয়ে আছে। বেচাবিক্রি নাই। শুনতেছি সরকার এলসিতে চাল আমদানি করবে। এই আতঙ্কে আমাদের মিলগুলোতে কেনাবেচা একদম নাই। কারণ সব মিলে অবিক্রিত চালে ভরা।’

মিল মালিকপক্ষের আরেক ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মালিকরা ধান থেকে চাল তৈরি করে লোকসান দিচ্ছেন। চাল বিক্রি করতে পারছে না। আগের চাল রাখার জায়গা নাই। এর মধ্যে সরকার বলছে, এলসি ঢুকাবে। তাই কেউ কিনতেছে না। সবাই ভাবতেছে চালের দাম আরও কমবে। সবাই আতঙ্কের মধ্যে আছে। যারা ধান কিনবে, তারাও আতঙ্কে আছে। যার কারণে ধানের দাম কম।’

বাধ্য হয়েই কম দামে ধান বিক্রি করছেন তারা

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) মো. নুর আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আসলে গুজব ছড়িয়েছে সরকার এলসির মাধ্যমে ভারত থেকে চাল আমদানি করছে। আসলে এটি গুজব। খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে গত ২৩ জুন একটা পরিপত্র জারি করা হয়েছে। একটা প্রেস রিলিজ দেওয়া হয়েছে। সরকারের এরকম কোনও পরিকল্পনা নেই। কৃষকদের কাছ থেকে সরকারি ন্যায্যমূল্যে ৩৬ টাকা কেজি দরে ধান সংগ্রহের কার্যক্রম অব্যাহত আছে। পাশাপাশি মিল থেকেও সরকার চাল ক্রয় করছে। এই চাল ক্রয়ে বাজারে একটা প্রভাব পড়ছে। যাতে বাজার ঊর্ধ্বগতি হয়। কৃষকরা যেন ন্যায্যমূল্য পান। কৃষকদের অনুরোধ করবো, গুজবে কান দেবেন না। আমরা বাজার মনিটরিং করছি।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া কৃষি বিপণন কর্মকর্তা আবু বকর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কৃষকরা যেন ন্যায্যমূল্য পান সে ব্যাপারে তাদের পরামর্শের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে।’

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চল থেকে ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৭৯০ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। এর মধ্যে আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে সরকার ৪৮ টাকা কেজি দরে ৪ হাজার ৯৯৩ মেট্রিক টন আতপ চাল এবং ৪৯ টাকা কেজি দরে ৬৯ হাজার ২৭২ মেট্রিক টন চাল কিনবে। ৩৬ টাকা দরে ১১ হাজার ৫৫ মেট্রিক টন ধান কিনবে।