টানা ভারী বর্ষণে কক্সবাজার জেলায় পাহাড়ধসে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতেই মারা গেছেন ১৩ জন। সদরে দুজন আর চকরিয়ায় দুজনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া ভারী বর্ষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। এখনও দুই লাখের বেশি মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পাহাড়ে অবস্থান করছে। একইসঙ্গে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় আছে বলে জানা গেছে।
জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, গত চার দিনের বৃষ্টিতে কক্সবাজার সদর, চকরিয়া, পেকুয়া, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, ঈদগাঁও ও মাতামুহুরী এলাকার বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হয়েছে। বহু বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া ও পেকুয়ার রাজাখালী, মগনামা ও উজানটিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েকটি মাছের ঘেরে পানি আটকে থাকায় জলাবদ্ধতা আরও তীব্র হয়েছে এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না নেওয়ায় দুর্ভোগ বেড়েছে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা খালেকুজ্জামান বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। এ কারণে পাহাড়সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে।’
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, অতিরিক্ত বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় উপজেলা প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে, পানিতে তলিয়ে গেছে জেলার বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক ও উপসড়ক। ভারী বর্ষণে রেললাইনের ওপর পানি উঠে যাওয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল চলাচল সাময়িক বন্ধ আছে। একইভাবে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌ-রুটে নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন গ্রামীণ জনপদের সড়ক-উপসড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় পাহাড় ধসের ঝুঁকি ও জলাবদ্ধতাসহ নানা কারণে মামুষের স্বাভাবিক জীবমযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, টানা ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। কয়েকদিনের অবিরাম বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকার মাটি নরম হয়ে পড়েছে। এতে সদর, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, ঈদগাঁও, চকরিয়া, মহেশখালী ও পেকুয়ার পাহাড়ঘেঁষা বসতিতে বসবাসকারী অন্তত দুই লাখ মানুষ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির। সেখানে কয়েক লাখ বাসিন্দা ঝুঁকিতে আছে। পাহাড়ের ঢালে নির্মিত আশ্রয়গুলোতে অতিবৃষ্টির কারণে ধসের আশঙ্কা বেড়েছে। শহরের বিভিন্ন পাহাড়সংলগ্ন এলাকায়ও প্রশাসন সতর্কতা জোরদার করেছে।
জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত আছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত এবং উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার কাজ চলছে।
উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের সোনারপাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা মোজাহের আলম, আব্বাস ও রহিম জানান, কালও রাতভর বৃষ্টি হওয়ায় আমাদের চোখে ঘুম নেই। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকি। প্রশাসন যদি আগে থেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে তাহলে অনেক মানুষ রক্ষা পাবে।
শহরের দরিয়ানগর এলাকার বাসিন্দা জাহানারা আক্তার বলেন, ‘একটানা বৃষ্টি। এর মধ্যে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। অনেকে মারা গেছে। আমরা চাই প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিক।’
উখিয়ার কুতুপালংয়ের স্থানীয় ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্প নয়, জেলার বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিটি ওয়ার্ড ও গ্রামে মানুষকে সচেতন করা দরকার। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে নিরাপদ স্থানে চলে গেছে। কেউ যেন ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের ঢালে অবস্থান না করেন, সে বিষয়ে সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছি।’
কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কক্সবাজার জেলায় রোহিঙ্গা বাদ দিলে অন্তত দুই লাখ মানুষ পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে আছে। পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণের কারণেই প্রতি বছর পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ছে। শুধু দুর্যোগের সময় নয়, সারা বছর পাহাড় সংরক্ষণে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়।’
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের প্রধান আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান বলেন, ‘মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আগামী কয়েকদিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হবে। অতিবৃষ্টির ফলে পাহাড়ধস, পাহাড়ি ঢল এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়বে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুসরণ করে সবাইকে সতর্ক থাকার অনুরোধ করা হয়েছে।’
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, কক্সবাজারে ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব উপজেলা প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশ ও ঢালে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্র, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা আছে।
কী করছে জেলা প্রশাসন
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাফিস ইনতেসার নাফির বলেন, ‘টানা কয়েকদিন ধরে মুষলধারে এবং থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির তোড়ে অনেক স্থানে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটছে। কক্সবাজার শহরের কলাতলীর হাজীপাড়ায় বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে থাকা বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে কার্যক্রম হয়েছে। ঝুঁকিতে থাকা লোকজনকে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার অনুরোধ করলেও অনেকে শুনতে চাচ্ছেন না।’
তিনি আরও জানান, কক্সবাজারের অন্য উপজেলাগুলোতেও পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকা বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে প্রশাসন ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মাইকিং করা হচ্ছে। যেকোনো দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার সব আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সদর উপজেলার ইউএনও তাহমিনা আক্তার বলেন, ‘টানা বর্ষণে বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি এখনও বেশি। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।’
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল সার্বক্ষণিক প্রস্তুত আছে। যেকোনো সময় পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা বা জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধার অভিযান চালানো যাবে। আমরা সবাইকে অনুরোধ করবো, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান না করে নিরাপদ স্থানে চলে যান। জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’
কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা, জাতিসংঘের সংস্থা এবং সহযোগী মানবিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজন হলে ঝুঁকিপূর্ণ আশ্রয়ে থাকা পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’