অর্ধশতাধিক মৃত্যু, বন্যা কেন এত প্রাণঘাতী হয়ে উঠলো

অতি ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায়। জেলাগুলো হলো- চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। এসব জেলায় বন্যা ও পাহাড়ধসে এ পর্যন্ত অন্তত ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন আট লাখ ৬৬ হাজার ৬১৪ জন মানুষ। যাদের অধিকাংশের বাড়িঘর ডুবে গেছে।

রবিবার (১২ জুলাই) সন্ধ্যা পর্যন্ত বন্যা ও পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫০ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজারে ২৮ জন, চট্টগ্রামে ১৩ জন, রাঙামাটিতে তিন জন ও বান্দরবানে ছয় জন। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, বন্যা ও পাহাড়ধস কেন প্রাণঘাতী হয়ে উঠলো এই অঞ্চলে। কী ব্যবস্থা নিয়েছিল প্রশাসন।

বন্যা কেন প্রাণঘাতী হয়ে উঠলো

বন্যা ও পাহাড়ধসে ব্যাপক প্রাণহানি এবং ভয়াবহ বিপর্যয়ের মূল কারণ ৪৩ বছরের রেকর্ড ভাঙা অতি ভারী বৃষ্টিপাত, উজান থেকে আসা তীব্র পাহাড়ি ঢল এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়া। পাশাপাশি বাড়িঘর ডুবে গেলেও আশ্রয়কেন্দ্রে না যাওয়ায় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন অনেকে। আবার অধিকাংশ মানুষ পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করলেও আশ্রয়কেন্দ্রে যাননি। প্রশাসন বারবার অনুরোধ কিংবা মাইকিং করলেও সাড়া দেননি। এ অবস্থায় কার্যকর কোনও পদক্ষেপও নেয়নি প্রশাসন। ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের সরাতে আইনি কোনও পদক্ষেপ নেয়নি তারা; যার ফলে কক্সবাজারে পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। 

এ ছাড়া বন্যা এত বেশি প্রাণঘাতী ও বিধ্বংসী হয়ে ওঠার আরেকটি কারণ রেকর্ড ভাঙা অতিভারী বৃষ্টিপাত। ৪৩ বছরের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে একদিনেই সর্বোচ্চ ৪১২ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এর সঙ্গে আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের তীব্রতা যুক্ত হয়। ভারতের ত্রিপুরা ও সংলগ্ন পার্বত্য অঞ্চল এবং দেশের ভেতরের পাহাড় থেকে উজান থেকে নেমে আসা পানি তীব্র গতিতে সমতলে ধেয়ে আসে। সাঙ্গু, ডলু ও শঙ্খ নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালী উপজেলাকে মুহূর্তেই ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এতে কারও কারও মৃত্যু হয়, আবার অনেকে আহত হন।

উলুছড়ি গ্রামের বাজার ও বেশকিছু বাড়ি বন্যার পানিতে ডুবে যায়

পাশাপাশি অতিভারী বর্ষণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে অন্তত ৯৭টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। পাহাড়ের পাদদেশে এবং ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে গড়ে ওঠা অস্থায়ী ও অবৈধ বসতিগুলো মাটির নিচে চাপা পড়ায় মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

এ ছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার ত্রুটিখাল ও নালা দখল আরেকটি কারণ। দশকের পর দশক ধরে চলা অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অবৈধ দখলের কারণে প্রাকৃতিক খাল ও পানি নিষ্কাশন নালাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প নেওয়া সত্ত্বেও সমন্বিত নগর পরিকল্পনা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারেনি।

আরেকটি কারণ হলো উদ্ধারকাজে দুর্গমতা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা। বন্যার পানিতে সড়ক এবং রেললাইন (যেমন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার লাইন) ডুবে যাওয়ায় দুর্গত এলাকাগুলো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ত্রাণ ও উদ্ধার পৌঁছাতে বিলম্ব হয়। পাহাড়ি ও অত্যন্ত দুর্গম এলাকা হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে সময়মতো জরুরি উদ্ধারকারী দল বা ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি প্রাণঘাতী করে তোলে।

তবে স্থানীয় লোকজন বলছেন, হাজার কোটি টাকার জলাবদ্ধতা প্রকল্প থাকা সত্ত্বেও শহরের পানি দ্রুত সরতে না পেরে দীর্ঘস্থায়ী কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি করেছে। উদ্ধারকাজের সমন্বয়হীনতা ছিল। পাহাড়ি এবং অত্যন্ত দুর্গম এলাকা হওয়ায় অনেক বন্যাকবলিত স্থানে উদ্ধারকারী দল সময়মতো পৌঁছাতে পারেনি। স্থানীয় সরকার কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে দুর্যোগ মুহূর্তে মাঠপর্যায়ে দ্রুত সাড়া দেওয়া ও সমন্বয় করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

বন্যার পানিতে ডুবে গেছে বাড়িঘর

সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে ভয়াবহ পরিস্থিতি 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও পানির নিচে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায়। দুই উপজেলার কয়েক লাখ বাসিন্দা এখনও পানিবন্দি। এ ছাড়াও হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, বোয়ালখালী, চন্দনাইশ ও লোহাগাড়া উপজেলায়ও বন্যায় বহু মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সাত উপজেলায় জেলা প্রশাসনের হিসেবে পানিবন্দি এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আট লাখের বেশি। তারা খাদ্য সংকটে পড়েছেন। এসব উপজেলায় পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছেনি বলে জানিয়েছেন বন্যাকবলিত এলাকার বাসিন্দারা। একই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানির সংকটেও পড়েছেন তারা। 

সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায় গত কয়েক দিন ধরে বেশিরভাগ এলাকায় বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন থাকায় অন্ধকারে দিন কাটছে অধিকাংশ পরিবারের। ঘরে নেই খাবার, রান্নার সুযোগ নেই, তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির। মোবাইল ফোনে চার্জ না থাকায় অনেকেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না আত্মীয়-স্বজনরা। এ দুই উপজেলায় ভেঙে পড়েছে অসংখ্য বসতঘর। 

বাঁশখালী উপজেলায় সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে পশ্চিম বাঁশখালীর কাথারিয়া, বড়ইতলী, গণ্ডামারা, ডোমরা, কদমরসূল, খানখানাবাদ, বাহারছড়া, চাম্বল, ছনুয়া, শেখেরখীল, সরল, রায়ছাটা, পুঁইছড়িসহ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায়। এসব এলাকার অধিকাংশ বাড়িঘর পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক একতলা বাড়িও পুরোপুরি পানিতে ডুবে রয়েছে। অসংখ্য কাঁচা ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে, পাকা ও আধাপাকা বাড়ির নিচতলায় জমেছে কোমরসমান পানি। অনেক পরিবার ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। আবার অনেকে বাড়ির উঁচু অংশ কিংবা টিনের ছাদে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আট লাখ ৬৬ হাজার ৬১৪ জন মানুষ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলার মানুষ। এই জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ছয় লাখ ৬২ হাজার। কক্সবাজারে এক লাখ ৫৮ হাজার ২৭ জন, রাঙামাটিতে তিন হাজার ৮২০ জন, খাগড়াছড়িতে ৩৪ হাজার ৪১৭ জন এবং বান্দরবানে আট হাজার ৩৫০ জন।

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও পানির নিচে

ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পাঁচ জেলায় মোট ১ হাজার ৭২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ৬৭০টি, কক্সবাজারে ৬৪০টি, রাঙামাটিতে ৪৭টি, খাগড়াছড়িতে ১৫০টি এবং বান্দরবানে ২২০টি। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে এ পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৫৫ জন আশ্রয় নিয়েছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রামের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ২২ হাজার ৬০০ জন, কক্সবাজারে দুই হাজার ৯৭৪ জন, রাঙামাটিতে তিন হাজার ৮২০ জন, খাগড়াছড়িতে দুই হাজার ৯১৬ জন এবং বান্দরবানে চার হাজার ৭৪৫ জন।

কী ব্যবস্থা নিলো জেলা প্রশাসন

সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিভাগের যে চার জেলায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে। পানিবন্দি লোকজনকে উদ্ধারের পাশাপাশি ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। অনেক এলাকা ডুবে থাকায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের বারবার অনুরোধ করা হলেও তারা আশ্রয়কেন্দ্রে আসেননি।’  

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে বন্যার ভয়াবহতা বেড়ে যায়। অনেক এলাকায় সাধারণ নৌকাও পৌঁছাতে পারেনি। তাই দুর্গম এলাকায় স্পিডবোট ব্যবহার করে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। সেখানে অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে বেশিরভাগ লোকজন আশ্রয়কেন্দ্রে আসেননি। যাদের পরবর্তীতে আর আনা যায়নি। গত শুক্রবার থেকে সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধার, নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া এবং ত্রাণ সহায়তা দিতে জেলা প্রশাসনগুলো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি প্রায় ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক মাঠে কাজ করছেন। এজন্য ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব হয়েছে।’

জেলা প্রশাসন আরও বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরের চিহ্নিত ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়কে পাঁচটি জোনে ভাগ করে প্রতিটি জোনে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিশেষ টিম এবং প্রায় ১৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক দিন-রাত কাজ করছেন। গত সোমবার রাত থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে আহ্বান জানানো হয়েছে। আগাম সতর্কতা, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও সার্বক্ষণিক মাঠপর্যায়ের উপস্থিতির মাধ্যমে প্রাণহানি কমিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল জেলা প্রশাসনের। দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের অধীন সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাপ্তাহিক ছুটিসহ সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়। প্রতিটি উপজেলায় এবং জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম চালু রেখে উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়।