টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে কুমিল্লা নগরী। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীসহ নগরীর সাধারণ লোকজন। বৃষ্টির কারণে সোমবার (১৩ জুলাই) সকালে নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি অনেক পরীক্ষার্থী। সরকারি-বেসরকারি অফিসগামীরাও হাঁটুপানি মাড়িয়ে গেছেন কর্মস্থলে। সড়কে অকেজো হয়ে পড়েছিল নানা পরিবহন। এ অবস্থায় নৌকায় চড়ে কেন্দ্রে যেতে দেখা গেছে পরীক্ষার্থীদের।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃষ্টির কারণে কেউ হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি মাড়িয়ে, আবার কেউ নৌকায় করে পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ করেছেন। সকালে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে এমন চিত্র দেখা যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভারী বর্ষণের কারণে জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যায় কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের পুরো আঙিনা। কলেজের কয়েকটি ভবনের নিচতলায়ও পানি ঢুকে পড়েছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা কলেজের সামনের সড়কের। সেখানে হাঁটু থেকে কোথাও কোথাও কোমরসমান পানি জমেছে। এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রে ঢুকতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন পরীক্ষার্থীরা। কেউ কেউ ভিজে গেছেন।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নগরীর মনোহরপুরের কুমিল্লা মহিলা কলেজ কেন্দ্রের ভেতর শিক্ষার্থীদের জন্য নৌকার ব্যবস্থা করা হয়। সকাল সাড়ে ৯টায় মহিলা সরকারি কলেজ কেন্দ্রের পরীক্ষার্থীরা নৌকায় করে কেন্দ্রে যান। আবার অনেকে কোমরপানি মাড়িয়ে গেছেন পরীক্ষা কেন্দ্রে।
সোমবার এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র, হিসাববিজ্ঞান প্রথম পত্র ও যুক্তিবিদ্যা প্রথম পত্র পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এই কেন্দ্রে মোট ১ হাজার ২০৯ জন পরীক্ষার্থী ছিলেন। জলাবদ্ধতার কারণে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীকে পরীক্ষা শুরুর পরও পানি মাড়িয়ে কেন্দ্রে ঢুকতে দেখা যায়।
সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের পরীক্ষার্থী রাজিয়া সুলতানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সকল বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত রাখা উচিত ছিল। বৃষ্টিতে ভিজে পরীক্ষার কেন্দ্রে যেতে হচ্ছে আমাদের। অধিকাংশ পরীক্ষার্থীকে ভেজা কাপড়ে কেন্দ্রে যেতে হয়। ডুবে যাওয়া সড়কে কাউকে কাউকে পড়ে যেতেও দেখেছি। বর্ষায় এভাবে পরীক্ষা না নিলেও হতো। এগুলো ভোগান্তি ছাড়া কিছুই নয়।’
ভোগান্তির কথা জানিয়ে মেয়েকে কেন্দ্রে নিয়ে আসা জেসমিন আক্তার বলেন, ‘কেন্দ্রে ঢোকার সময়ই মেয়ের স্কুলড্রেস ভিজে গেছে। এই অবস্থায় বসে পরীক্ষা দিয়ে মেয়েটা অসুস্থ হয়ে পড়বে। শত শত শিক্ষার্থীর একই অবস্থা। পরীক্ষাটা স্থগিত করলেই ভালোই হতো। এটি সবার জন্য ভোগান্তি ডেকে এনেছে।’
কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এ কে এম জহিরুল আলম বলেন, ‘অন্য পরীক্ষার সময় নিচতলার কয়েকটি কক্ষে শিক্ষার্থীদের আসন ছিল। কিন্তু আজকে জলাবদ্ধতার কারণে কোনও ভবনের নিচতলায় পরীক্ষা হয়নি। দোতলা থেকে ওপরের দিকের কক্ষগুলোয় পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমাদের এই কেন্দ্রে ১ হাজার ২০৯ জন পরীক্ষার্থী। কলেজের আঙিনা আর সড়কে পানি থাকায় পরীক্ষার্থীরা কেন্দ্রে ঢুকতে দুর্ভোগে পড়েন। তবে পরীক্ষা গ্রহণে কোনও সমস্যা হয়নি।’
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের পরীক্ষারা এই কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়েছেন। ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবুল বাসার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই কেন্দ্রে আটটি কলেজের পরীক্ষার্থী আছে। তবে সড়ক ও কেন্দ্রের সামনে পানি থাকলেও রুমের ভেতর পানি ছিল না। যেসব পরীক্ষার্থী একটু দেরিতে কেন্দ্রে এসেছিল, তাদের অতিরিক্ত সময় দিতে বোর্ড থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর আহসান পারভেজ বলেন, ‘বোর্ডের অধীন ছয় জেলায় ভারী বর্ষণে কেন্দ্রের সামনে ও রাস্তায় জলাবদ্ধতা দেখা দিলেও কক্ষের ভেতর কোথাও পানি ঢোকেনি। যেসব পরীক্ষার্থী কিছুটা বিলম্বে কেন্দ্রে গেছে তাদের বিষয়টি সহানুভূতির সঙ্গে দেখতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আশা করি, কোনও পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা দিতে সমস্যা হয়নি।’
পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগের খবর পেয়ে দ্রুত কেন্দ্রে যান কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা (টিপু), ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুন, কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আলী রাজিব মাহমুদ মিঠুনসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। পরে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে কয়েকটি প্লাস্টিকের নৌকা ও ভ্যানের ব্যবস্থা করা হয়। সেগুলোয় করে অনেক পরীক্ষার্থীকে কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া হয়।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, ‘পরীক্ষা শুরুর আগ থেকে সরকারি কলেজ কেন্দ্রের সামনে এসেছি। সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষার্থীদের নিরাপদে কেন্দ্রে প্রবেশের কাজ তদারকি করেছি।’
কয়টি কেন্দ্রে এমন তৈরি হয়েছিল জানতে চাইলে কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আলী রাজিব মাহমুদ মিঠুন বলেন, ‘অন্য কোনও কেন্দ্রে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্র এলাকাটি নিচু হওয়ায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি দেখেছি। কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পরীক্ষার্থীদের কিছুটা বাড়তি সময় দেবেন, যেন তাদের পরীক্ষার ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা না হয়।’
এর আগে গত এপ্রিলে এসএসসি পরীক্ষার সময়ও কুমিল্লার একটি কেন্দ্রে এমন ঘটনা ঘটে। গত ২৮ এপ্রিল কুমিল্লা ঈশ্বর পাঠশালার এসএসসি পরীক্ষার কক্ষে পানি প্রবেশ করে। ভবনটির প্রতিটি কক্ষে বসার বেঞ্চে পা তুলে পরীক্ষা দেয় শিক্ষার্থীরা। হল পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরাও চেয়ারে পা তুলে বসে দায়িত্ব পালন করেন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের কাছে ফোন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
আবহাওয়া অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সোমবার মাত্র তিন ঘণ্টায় ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে কুমিল্লায়। এতে তলিয়ে গেছে নগরীর প্রধান সড়ক, অলিগলি ও আবাসিক এলাকা। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন মানুষজন।
কুমিল্লা আবহাওয়া কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছৈয়দ আরিফুর রহমান বলেন, ‘সোমবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ৩ ঘণ্টায় কুমিল্লা নগরে ১০৭ মিলিমিটার এবং গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এ বৃষ্টিতে নগরের অধিকাংশ সড়কে হাঁটু থেকে কোথাও কোথাও কোমরসমান পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হয়।’