চট্টগ্রামের ১০ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে হত্যার মামলায় আসামি মো. রুবেলকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সোমবার (২০ জুলাই) চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক মো. সাইফুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডিত রুবেল আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
এ ছাড়া রায়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭ ধারায় দণ্ডিত আসামি মো. রুবেলকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৯(৪)(খ) ধারায় ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও কারাদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মাহমুদ-উল আলম চৌধুরী মারুফ বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
তিনি বলেন, মামলায় ২৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য-প্রমাণে ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হওয়ার পর শিশুটিকে হত্যার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তাই আদালত আসামি মো. রুবেলকে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মৃত্যুদণ্ড দেন।
এর আগে ২০২৩ সালের ২৯ মার্চ ভোরে চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী থানার সাগরিকা বাই লেনের মুরগি ফার্ম আলমতারা পুকুরপাড় এলাকার একটি ডোবা থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
হত্যার শিকার শিশুটি পাহাড়তলী এলাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী ছিল। পাহাড়তলীর আব্দুর কাজীর দীঘিরপাড় এলাকায় তাদের বাসা। শিশুটির মা একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। আর বাবা কাজ করতেন ঢাকার একটি পোশাক কারখানায়।
২০২৩ সালের ২১ মার্চ বিকাল থেকে শিশুটির খোঁজ পাচ্ছিল না পরিবার। থানায় জিডি করেও সন্ধান না মেলায় সাত দিন পর, ওই বছরের ২৮ মার্চ আদালতে গিয়ে অপহরণের মামলা করেন শিশুটির মা। বিচারক তার আবেদন শুনে অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করতে পাহাড়তলী থানার ওসিকে নির্দেশ দেন।
মামলার এজাহারে শিশুটির মা উল্লেখ করেন, ‘ঘটনার দু-তিন দিন আগে স্কুলের এক বান্ধবী বিড়াল কিনেছে জানিয়ে আমার কাছে বিড়ালছানা কিনে দেওয়ার আবদার করে মেয়ে। তখন বলেছিলাম, বেতন পেলে বিড়ালছানা কিনে দেব। তখন সে বলেছিল, রাস্তার এক তরকারি বিক্রেতা বলেছে, তার এক পরিচিত লোক আছে। সেখান থেকে আমাকে বিড়ালছানা এনে দেবে।
২০২৩ সালের ২০ মার্চ রাস্তায় বিড়ালছানা ধরতে গিয়ে সবজি বিক্রেতা রুবেলের ভ্যানের সঙ্গে ধাক্কা লাগে শিশুটির। বিড়ালছানা এনে দেবে বলে তখন শিশুটির সঙ্গে প্রায় পাঁচ মিনিট কথা বলেছিল প্রতিবেশী রুবেল। পরদিন ২১ মার্চ বিকেলে আবার রাস্তায় দেখা হলে শিশুটিকে বিড়ালছানা দেবে বলে ভ্যানে করে একটি ফাঁকা বাসায় নিয়ে যায়।
মামলাটির তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক ইলিয়াস খান তখন জানিয়েছিলেন, ওই বাসায় নিয়ে গিয়ে রুবেল শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। ওই সময় শিশুটি চিৎকার করে দরজা খুলে বাসা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে তাকে ভয়ভীতি দেখায় এবং বিষয়টি কাউকে না জানানোর জন্য হুমকি দেয়। বিষয়টি অন্যদের জানিয়ে দেবে—এই ভয় থেকে রুবেল শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।
মামলায় প্রতিবেশী সবজি বিক্রেতা ৩৫ বছর বয়সী মো. রুবেলকে আসামি করা হয়। তদন্তে স্থানীয় সবজি বিক্রেতা মো. রুবেলের সম্পৃক্ততা উঠে এলে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিখোঁজের নয় দিন পর মুরগি ফার্ম এলাকার একটি ডোবা থেকে শিশুর গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে শিশুটির একটি গেঞ্জি, এক জোড়া স্যান্ডেল, একটি কালো পায়জামা ও একটি গাঢ় নেভি ব্লু রঙের হিজাবও উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতারের পর রুবেল ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন।
তদন্ত শেষে পুলিশ রুবেলের বিরুদ্ধে অপহরণ, ধর্ষণচেষ্টা, খুন ও মরদেহ গুমের অভিযোগে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন। মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে গত ৮ জুলাই আসামিকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর ১৪ জুলাই যুক্তিতর্ক শেষ হলে আদালত ২০ জুলাই রায়ের জন্য দিন ধার্য করেন।