যে কারণে নীরবে উদ্বোধন হলো ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রীস্তম্ভ পার্ক

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের কামাউড়া নামক স্থানে অনেকটা অনাড়ম্বর পরিবেশে উদ্বোধন করা হয়েছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নিহত ভারতের মিত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর স্মরণে নির্মিত বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রীস্তম্ভ পার্ক। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে পার্কটির উদ্বোধন করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ। এ সময় তার সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ঠিকাদার ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে আশুগঞ্জের কামাউড়ায় মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি স্মারক ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রীস্তম্ভ ও পার্কের নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে গত বছরের (২০২৫) নভেম্বর মাসে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এটি উদ্বোধন করার কথা ছিল।

কিন্তু বৃহস্পতিবার অনেকটা নীরবেই ফিতা কেটে উদ্বোধন করা হলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে দুই দেশের স্মৃতি স্মারক দৃষ্টিনন্দন মৈত্রীস্তম্ভ পার্কটি।

অনাড়ম্বর পরিবেশে পার্কটির উদ্বোধন সম্পর্কে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাস আবু সাঈদ বলেন, ‘আমরা মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছিলাম। তারা সবাই আসলে একসঙ্গে হতে পারছেন না। আমাকে বলেছেন, উদ্বোধন করার জন্য। কারণ পার্কটির জিনিসপত্র ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হতে চলেছে। তাই জনসাধারণের জন্য দ্রুত পার্কটি উন্মুক্ত করার জন্যই অনাড়ম্বর পরিবেশে উদ্বোধন করা হয়েছে।’

অপর এক প্রশ্নে জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ জানান, এটির জনসাধারণের জন্য জেলা প্রশাসনের অধীনে আপাতত উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। জনপ্রতি ২০ টাকা করে প্রবেশ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

মৈত্রীস্তম্ভ পার্কটিতে কী আছে জানতে চাইলে জানান, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আদলে মুক্তিযুদ্ধের কিছু স্মৃতি চিহ্ন রয়েছে। ভেতরে থাকা নামের তালিকায় কাদের নাম আছে? জানতে চাইলে কৌশলে এড়িয়ে যান।

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মুক্তিযোদ্ধা জানান, বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক বর্তমানে স্বাভাবিক না থাকায়, অনেকটা অনাড়ম্বর পরিবেশে পার্কটি উদ্বোধন করা হয়েছে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকর্মের ওপর আঘাত আসতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই নীরব পরিবেশে উদ্বোধনের দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হয়। এর বেশি কথা বলতে চাননি তিনি।

যে কারণে আশুগঞ্জে মৈত্রীস্তম্ভ

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, ১৯৭১ সালে তুমুল যুদ্ধের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পূর্বাঞ্চলের আখাউড়া ৬ ডিসেম্বর মুক্ত হয়। পরে মিত্র বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা অগ্নিঝরা দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে অগ্রসর হন। কোনও ধরনের প্রতিরোধ যুদ্ধ ছাড়াই ৮ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া মুক্ত হয়। পরে ভারতের ৪র্থ মাউন্টেন ডিভিশনের মিত্র বাহিনীর সদস্যরা ও মুক্তিবাহিনীর এস ফোর্সের প্রধান মেজর জেনারেল কে এম সফিউল্লাহর নেতৃত্বে যৌথভাবে আশুগঞ্জের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে ভুল তথ্যের কারণে ৯ ডিসেম্বর রাতে আশুগঞ্জ সোহাগপুর ও কামাউড়া এলাকায় মিত্রবাহিনীর সদস্যরা এলে আগে থেকে ওতপেতে থাকা পাক বাহিনীর সদস্যরা তীব্র হামলা চালায়। এতে উভয়পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে ভারতের অনেক সৈন্য প্রাণ হারান, হতাহত হন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা। এই যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের এই আত্মত্যাগের স্মরণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় আশুগঞ্জে ‘মৈত্রী স্মারক’ স্মৃতিস্তম্ভ পার্কটি নির্মাণ করে।

স্থানীয়রা জানান, এই মৈত্রী স্মারকের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে।

কী আছে মৈত্রী স্মৃতিস্তম্ভে

ভেতরে প্রবেশ করার আগে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে রয়েছে গ্লাসের দৃষ্টিনন্দন বেষ্টনী। পরে চোখে পড়বে ১৯৭১ এর অগ্নিঝরা দিনগুলো দেয়ালে ভাস্কর্য আকারে তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, ছেলে সন্তানসহ নারী-পুরুষরা উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে চলে যাওয়ার দৃশ্য, মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনে সম্মুখযুদ্ধ, পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্য, এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম, জয় বাংলা ও সিকান্দার আবু জাফরের কবিতার লাইন, ‘তুমি আমার বাতাস থেকে মোছো তোমার ধুলো’।

ভারতীয় বাহিনীর কারা শহীদ হয়েছিলেন

আশুগঞ্জ যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৭৯ কর্মকর্তা, ৭০ জন জেসিও, ভারতীয় সেনাবাহিনীর অন্য র‍্যাংকের ১৪৮২ সদস্য, ইস্টার্ন থিয়েটার থার্টি বিএসএফের ২৯ সদস্য, ইস্টার্ন থার্টি এয়ার ফোর্সের ১১ কর্মকর্তা, ইস্টার্ন থার্টি নেভির ৬ সদস্য শহীদ হন। তাদের প্রত্যেকের নামের তালিকা লোহার ভারী শিটে খোদাই করে মৈত্রীস্তম্ভের বেষ্টনীতে লেখা রয়েছে।

স্মৃতিস্তম্ভে পার্ক সম্পর্কে যা বললেন যুদ্ধকালীন কমান্ডার

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে যুদ্ধকালীন কমান্ডার নুরুল ইসলাম বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালে ৯ ডিসেম্বর ভোরে পাঞ্জাবিদের এম্বোশে আমরা পড়ে গেলাম। এর মধ্যে একজন মুক্তিযোদ্ধা মারা গেলো। এটার মূল যুদ্ধ হয়েছে সোহাগপুর, বাহাদুরপুর, দুর্গাপুর মিলিয়ে যুদ্ধ হয়েছে। সেখানে বহু হতাহত হয়েছে। ভারতীয় অনেক সৈন্য মারা গেছে এই যুদ্ধে। পাক বাহিনীর কিছু লোক মারা গেছে। তখন আমরা সেখান থেকে বগইর পর্যন্ত এলাম। তখন ভৈরব থেকে আর্টিলারি মারলো বগইরে। তখন সেখান থেকে আমরা চলে আসলাম বেড়তলা। বেড়তলা থেকে পরের দিন আমরা এগিয়ে গেলাম আশুগঞ্জের দিকে। ওই যুদ্ধে ভারতের তিনটি ট্যাংক ধ্বংস হয়েছে সোহাগপুর গ্রামে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই যে মৈত্রীস্তম্ভটি করেছে, আমাদের বর্তমান প্রজন্ম জানে না- মুক্তিযুদ্ধে ঠিক কি হয়েছে। এই স্মৃতিস্তম্ভের মাধ্যমে এরা সবাই জানতে পারবে। সেজন্য আমরা বাংলাদেশ সরকার ও ভারত সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের আহ্বায়ক যা জানালেন

জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের আহ্বায়ক হাজী সৈয়দ এমরানুর রেজা সম্প্রতি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আশুগঞ্জে যে মৈত্রীস্তম্ভটি করা হয়েছে এটাতে ইতিহাসটা আছে। বাংলাদেশের সৃষ্টির ইতিহাস, তাদের সারেন্ডারের ইতিহাস বাংলাদেশের প্রথম ভাগ থেকে শেষ ভাগ পর্যন্ত সমস্ত ইতিহাস আছে মৈত্রীস্তম্ভে। নিয়াজি যে আত্মসমর্পণ করলো এই দৃশ্যগুলো চিত্রের মধ্যদিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলে নতুন প্রজন্ম অনেক কিছুই জানতে পারবে।’
ভারতকে আমরা বন্ধু রাষ্ট্রের ভূমিকায় দেখতে চাই।

এদিকে আশুগঞ্জ উপজেলার সদ্য বিদায়ী নির্বাহী কর্মকর্তা রাফে মোহাম্মদ ছড়া বলেন, মৈত্রীস্তম্ভটি গত নভেম্বর মাসে ঠিকাদার থেকে গণপূর্ত বিভাগের মাধ্যমে আমরা বুঝে পেয়েছি। বর্তমানে এটি উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। স্তম্ভটি বেসরকারি খাতে লিজ দেওয়ার জন্য যাবতীয় কার্যক্রম গ্রহণ চলছে। প্রায় সাড়ে তিন একর জমির ওপর মৈত্রীস্তম্ভটি নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করে মেসার্স নির্মাণ বিল্ডার্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। নির্মাণকাজে ব্যয় হয়েছে ৭২ কোটি টাকা।