‘আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে? আমাকে জবাব দেন, আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে? আমি এই কুমিল্লায় চাকরি করতে এসেছি, এটা কি আমার অন্যায়? আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে, আমি এটার জবাব চাই?’
ছেলে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর এভাবেই বিলাপ করে কথাগুলো বলছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম। ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) অপ্রতিমের বাসায় যান স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। এ সময় ছেলেকে হারানোর শোকে ভেঙে পড়েন নাহিদা বেগম।
নাহিদা বেগম বলেন, ‘আমি কোনও বিচার চাই না, আমাকে এর উত্তর দিতে হবে। আমার ছোট্ট একটা ছেলে, সে কি অন্যায় করেছে। তার কী অন্যায় ছিল, আমি শুধু জানতে চাই। এটা কোন দেশ?’
এরপর ছেলেকে হারিয়ে কীভাবে জীবন কাটাবেন, সেই অসহায়ত্বের কথাও বলতে থাকেন তিনি। বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘আমার তো একটাই ছেলে। আমি কেমনে আমার জীবন কাটাবো? আমি আমার জীবন পার করবো কেমনে? আমারে একটু সবাই বলেন, আমি আমার জীবনটা পার করবো কেমনে।’
মায়ের এসব কথা শুনে মনিরুল হক চৌধুরীও কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘এর কোনো জবাব আমার কাছে নেই মা।’
নিখোঁজের প্রায় ২০ ঘণ্টা পর শনিবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের (১৩) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী জঙ্গল লালমাই সানন্দা পাহাড় এলাকায় তার মরদেহ পাওয়া যায়।
অপ্রতিম বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার একজন ব্যবসায়ী।
শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মায়ের মোবাইল ফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয় অপ্রতিম। এরপর আর বাসায় ফেরেনি। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাননি। পরে তার বাবা কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
ছেলের শেষ সময়ের কথা বলতে গিয়ে অপ্রতিমের বাবা জানান, শুক্রবার জুমার নামাজ পড়ে এসে ছেলেকে খাওয়ান তিনি। এরপর তাকে বলেছিলেন, বাবা তুমি থাকো, আজ দুজনে মিলে মুভি দেখি। মুভি শেষে তাকে একটি গিফট দেওয়ার কথাও বলেছিলেন। কিন্তু অপ্রতিম বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বাইরে যাওয়ার কথা জানায়। এরপর সে বাইরে চলে যায়।
অপ্রতিমের বাবা বলেন, ‘আমাদের একটাই ছেলে। অন্যায় করলে ওরে মেরে ফেল, অন্যায় করে নাই। ওর ফোন নিয়ে... ফোনটা নেওয়ার জন্য ওকে মেরে ফেললো, এটা কী হলো?’
ছেলেকে হারানোর পর কীভাবে তার মুখের দিকে তাকাবেন, সেই কষ্টের কথাও বলেন তিনি। অপ্রতিমের বাবা জানান, ছেলে নিয়মিত নামাজ পড়তো এবং বন্ধুদের সঙ্গে নামাজ পড়তে যেতো।
এসময় এমপি মনিরুল হক বলেন, ‘কোনো ভাষা নাই রে বাবা, মাসুম একটা ছেলে।’
এদিকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে কুবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ ভিড় করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু আলামত সংগ্রহ করেছেন।
দুপুর পৌনে ৩টার দিকে ঘটনাস্থলে আসেন সদর আসনের এমপি মনিরুল হক চৌধুরী। এ সময় তিনি হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আটক করতে পুলিশকে নির্দেশ দেন।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি রকিবুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা অনেকটা নিশ্চিত, মোবাইল ফোনের জন্যই এ হত্যার ঘটনা।’ এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তুহিন নামের এক যুবককে আটক করা হয়েছে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অপ্রতিমের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।