‘কাকা, এখানে একটা বাচ্চা পড়ে আছে’, ভাতিজার কথায় জঙ্গলের ভেতর গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় একটি শিশুকে পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুল কাদির জিলানী। পরে জানা যায়, শিশুটি কুমিল্লা বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩)।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কসংলগ্ন পশ্চিম সানন্দার একটি টিলা থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে শুক্রবার বিকেলে কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হয়ে নিখোঁজ হয়েছিল সে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদির জিলানী জানিয়েছেন, তারা ওই এলাকায় কাজে গিয়েছিলেন। কাজের প্রয়োজনে বাঁশ সংগ্রহ করতে জঙ্গলের দিকে যাওয়ার সময় তার সঙ্গে থাকা ভাতিজা তাকে বলে, ‘কাকা, এখানে একটা বাচ্চা পড়ে আছে।’
কাদির জিলানী বলেন, এরপর সেখানে গিয়ে তারা শিশুটিকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। ভয় পেয়ে তারা কাজ ফেলে সেখান থেকে চলে যান। কিছুক্ষণ পর জানতে পারেন, এক ম্যাডামের সন্তান নিখোঁজ হয়েছে। তখন তারা জঙ্গলের ভেতর একটি শিশুকে পড়ে থাকতে দেখার বিষয়টি জানান।
পরে স্থানীয় লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে তারা ঘটনাস্থলে যান। বেলা ১১টার দিকে সেখানে শিশুটিকে পড়ে থাকতে দেখা যায় বলে জানান কাদির জিলানী।
এর আগে শনিবার ভোরে অপ্রতিমের মুঠোফোনের সর্বশেষ অবস্থানের তথ্যের ভিত্তিতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন সামাজিক বনায়ন এলাকায় তল্লাশি শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কসংলগ্ন পশ্চিম সানন্দার একটি টিলায় অপ্রতিমের মরদেহ দেখতে পান তারা। পরে পুলিশ গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
অপ্রতিম কুমিল্লা বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম তার মা। তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার একজন ব্যবসায়ী।
শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মায়ের মোবাইল ফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয় অপ্রতিম। এরপর আর বাসায় ফেরেনি। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাননি। পরে তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
ছেলের মরদেহ উদ্ধারের পর শোকে ভেঙে পড়েন অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম। শনিবার তার বাসায় যান স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। এ সময় বিলাপ করে নাহিদা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে? আমাকে জবাব দেন, আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে? আমি এই কুমিল্লায় চাকরি করতে এসেছি, এটা কি আমার অন্যায়? আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে, আমি এটার জবাব চাই?’
তিনি বলেন, ‘আমি কোনও বিচার চাই না, আমাকে এর উত্তর দিতে হবে। আমার ছোট্ট একটা ছেলে, সে কি অন্যায় করেছে। তার কী অন্যায় ছিল, আমি শুধু জানতে চাই। এটা কোন দেশ?’
এরপর তিনি বলেন, ‘আমার তো একটাই ছেলে। আমি কেমনে আমার জীবন কাটাবো? আমি আমার জীবন পার করবো কেমনে? আমারে একটু সবাই বলেন, আমি আমার জীবনটা পার করবো কেমনে।’
মায়ের এসব কথা শুনে মনিরুল হক চৌধুরীও কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘এর কোনো জবাব আমার কাছে নেই মা।’
অপ্রতিমের বাবা জানান, শুক্রবার জুমার নামাজ পড়ে এসে ছেলেকে খাওয়ান তিনি। এরপর তাকে বলেছিলেন, ‘বাবা তুমি থাকো, আজ দুজনে মিলে মুভি দেখি। মুভি শেষে তোমাকে একটা গিফট দিব।’ কিন্তু অপ্রতিম বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বাইরে যাওয়ার কথা জানায়। এরপর সে বাইরে চলে যায়।
অপ্রতিমের বাবা বলেন, ‘আমাদের একটাই ছেলে। অন্যায় করলে ওরে মেরে ফেল, অন্যায় করে নাই। ওর ফোন নিয়ে... ফোনটা নেওয়ার জন্য ওকে মেরে ফেললো, এটা কী হলো?’
তিনি জানান, অপ্রতিম নিয়মিত নামাজ পড়তো এবং বন্ধুদের সঙ্গে নামাজ পড়তে যেতো।
এদিকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে কুবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ ভিড় করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু আলামত সংগ্রহ করেছেন। দুপুর পৌনে ৩টার দিকে ঘটনাস্থলে আসেন সদর আসনের এমপি মনিরুল হক চৌধুরী। এ সময় তিনি হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আটক করতে পুলিশকে নির্দেশ দেন।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা অনেকটা নিশ্চিত, মোবাইল ফোনের জন্যই এ হত্যার ঘটনা।’ এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এক যুবককে আটক করা হয়েছে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অপ্রতিমের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
তবে অপ্রতিমের মৃত্যুর কারণ এবং কীভাবে সে ওই স্থানে পৌঁছাল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে জানান ওসি। বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশ।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, পুলিশের একাধিক দল মাঠে কাজ করছে। তারা কিছু সূত্র পেয়েছেন এবং একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার বলেন, ‘সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টার মধ্যে ঘটনা ডিটেক্ট করে ফেলি এবং মূল আসামি ধরে ফেলেছি।’ তবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে থাকা ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডে জড়িত কি না, সে বিষয়ে পুলিশ এখনই নিশ্চিত নয় বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘এটা এখনও জিজ্ঞাসাবাদের পর্যায়ে আছে। আমাদের একটু সময় দেওয়া লাগবে। কারণ তার মোবাইল, তার প্রযুক্তি, তার লোকেশন; এই যে ছেলেটি অপ্রতিম মারা গেলো, এর লোকেশন; আমরা এখানে অনেক কিছু মিলাই। যাকে ধরেছি, সে নির্দোষ হতে পারে, আবার দোষীও হতে পারে।’
পুলিশ সুপার আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত, এর মোটিভ কী ছিল এবং কী উদ্দেশ্যে অপ্রতিমকে হত্যা করা হলো, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এটা কি শুধুই একটি আইফোনের জন্যই ছিল, নাকি এর সঙ্গে অন্য কিছু জড়িত; এ বিষয়টি আমরা সঠিকভাবে খতিয়ে দেখবো, তদন্ত করবো।’
অপ্রতিমের শরীরে কী ধরনের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, সুরতহাল এখনও সম্পন্ন হয়নি। সুরতহাল শেষ হলে এ বিষয়ে বলা যাবে।