ইলিশের দাম কেজিতে কমেছে ৩০০ টাকা, বাজারে বেড়েছে সরবরাহ

মৌসুমের শেষ দিকে এসে চাঁদপুরের বাজারে বেড়েছে ইলিশের সরবরাহ। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দামও কমেছে প্রতি কেজিতে দেড় থেকে ৩০০ টাকা। যদিও দেশে ইলিশের গড় উৎপাদন কমার পাশাপাশি চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখনও সংকট রয়েছে বাজারে। তাই চাহিদা মেটাতে প্রথমবারের মতো ভারত থেকে ইলিশের দেশ বাংলাদেশে ৫০০ টন ইলিশের আমদানি অবাক করেছে অনেককেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদী ও সাগরে গত কয়েক বছর ধরে ইলিশের প্রাপ্যতা কমায় ইলিশ আহরণের গড় খরচ বেড়েছে। এসবের প্রভাবে দাম বেড়েছে ইলিশের।

চাঁদপুর বড়স্টেশন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবসায়ী বাদশা মাল বলেন, উপকূলীয় এলাকাগুলো থেকে প্রচুর পরিমাণে ইলিশ আসছে। কিছুটা ছোট আকারের হলেও মাছের আমদানি বাড়ায় খুশি ব্যবসায়ীরা। আশা করছি, অভিযানের আগ পর্যন্ত ইলিশের সরবরাহ বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে।

তিনি বলেন, ভালো মাছের দাম এখনও খুব একটা কমেনি। এক কেজি সাইজের তাজা মাছ এখনও ২৩০০-২৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর যে মাছের পেটে ডিম অত্যন্ত বেশি সেগুলো ১৬০০-১৮০০ টাকা বিক্রি হয়।

ভারত থেকে মাছ আমদানি প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীরা বলেন, এই মাছের কোয়ালিটি ভালো না, পেটে প্রচুর ডিম। এ কারণে আমাদের দেশে মাছগুলো পাঠিয়ে দিচ্ছে।

চাঁদপুর মৎস্য বনিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক শবে বরাত সরকার বলেন, চাঁদপুর বড় স্টেশন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে গত কয়েকদিন ধরে মাছের সরবরাহ বেড়েছে। বুধবার ৭০০-৮০০ মণ ইলিশ মাছ এ বাজারে উঠেছে। মাছের সরবরাহ বাড়ায় দামও ধীরে ধীরে কমছে। চাঁদপুরের নদীর পাশাপাশি নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, হাতিয়াসহ উপকূলীয় অঞ্চল থেকে মাছগুলো আসছে। সরবরাহ বাড়ায় প্রতিদিনই মাছের দাম কমছে।

তিনি বলেন বর্তমানে এক কেজি সাইজের মাছ বিক্রি হচ্ছে ২৩০০, ৭০০/৮০০ গ্রামের প্রতি কেজি ১৭০০-১৯০০, ৫০০ গ্রামের প্রতি কেজি এক হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অভিযানের আগে আশা করি মাছের সরবরাহ কমবে না। ফলে প্রতিদিনই মাছের দাম অল্প করে হলেও কমবে।

চাঁদপুর বড়স্টেশন আড়তের ব্যবসায়ী শাহ আলম বলেন, পুরো মৌসুমজুড়েই এবার ইলিশের সরবরাহ কম হয়েছে। তবে কয়েকদিন হলো ইলিশের সরবরাহ বাড়ায় প্রতি কেজি ইলিশের দাম কমেছে দুই থেকে তিনশ টাকা পর্যন্ত।

ইলিশ গবেষক ড. আনিছুর রহমান বলেন, ইলিশ আমাদের এখান থেকেই সব জায়গায় রফতানি হতো। এখন ইলিশ কতটা কমেছে যে আমাদের এখানে ইলিশ আমদানির খবর পাচ্ছি। এ বছরও ইলিশের উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা দেখছি না। 

তিনি বলেন, বিষয়গুলো ভেবে দেখতে হবে এবং ভালোভাবে গবেষণার মাধ্যমে কারণ খুঁজে বের করে সমস্যা নিরসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সেজন্য মৎস্যখাতের অভিজ্ঞদের সবাইকে নিয়ে দীর্ঘ ও মধ্য মেয়াদী কাজ করতে হবে। এমনকি আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে অনেকগুলো কাজ করতে হবে।

এ গবেষক বলেন, জাতীয় মাছ ইলিশ সম্পদ কমে গেছে। বড় ইলিশ অনেক কমে গেছে। তাই সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আগামী দুই-চার বছরের মধ্যেই শুধু ইলিশ নয়, অন্য মাছের উৎপাদনে আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যা অত্যন্ত আশঙ্কার বিষয়।

মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ও ইলিশের পোনা জাটকা সংরক্ষণে অভয়াশ্রম, বঙ্গোপসাগরে মাছের সুষ্ঠু প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রাখা এবং এই সময়ে জেলেদের সচেতনতা ও সরকারি প্রণোদনা প্রদানসহ সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে ইলিশের উৎপাদন। তবে সর্বশেষ তিন বছরে উৎপাদন কমেছে ৭ শতাংশেরও বেশি।

জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, ২০০৩-০৪ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮৩৯ মেট্রিক টন। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে উৎপাদন ছিল ৭১ হাজার এক মেট্রিক টন, সামুদ্রিক জলাশয়ে এক লাখ ৮৪ হাজার ৮৩৭ মেট্রিক টন। গত দুই দশকের মধ্যে একেক বছর উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এক থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ মেট্রিক টন। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে ২ লাখ ৭১ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন, সামুদ্রিক জলাশয়ে ৩ লাখ ১২ মেট্রিক টন।

তবে নদী দূষণ, শত শত ড্রেজারে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনসহ নানা কারণে ইলিশ উৎপাদনের বৃদ্ধির ধারা ব্যাহত হচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ ইলিশের উৎপাদন কমে উৎপাদন দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ মেট্রিক টনে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে ৫ লাখ মেট্রিক টনে নেমেছে।