চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী এবং একটি কিশোর গ্যাং গ্রুপের কথিত বড় ভাই হিসেবে পরিচিত তিনি। সম্প্রতি একটি হত্যাকাণ্ডেও তার নাম এসেছে। তাকে গ্রেফতারে পুলিশ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। তবে কথিত ক্ষমতাসীন নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকার কারণে তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর মধ্যে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র কার্যালয়ে বগা অবস্থান করছেন এমন গোপন তথ্য পেয়ে সেখানে যায় খুলশী থানা-পুলিশ। প্রথমে পুলিশ নগর ভবন ঘিরে ফেলে। পরে বগাকে গ্রেফতারে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে।
এ সময় চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন পুলিশকে বাধা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে তার বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে ঘটনাস্থলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপকমিশনার ফয়সাল আহমেদ উপস্থিত হন। পরে মেয়রের হস্তক্ষেপে পুলিশ অভিযান বন্ধ করে ফিরে যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
চট্টগ্রামের রাজনীতিতে বগা চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
বগার বিরুদ্ধে ১৭ মামলা
ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। খুলশী, পাহাড়তলী ও আকবর শাহ এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক, দখলবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে অন্তত ১৭টি মামলা রয়েছে।
যে কারণে দল থেকে বহিষ্কার
চলতি বছরের জুনে একটি সরকারি জায়গা দখল নিয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে প্রকাশ্যে গোলাগুলিতে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে বগার বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় গত ৮ জুন তাকে স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
কিশোর গ্যাং ‘সেভেন স্টার’ পরিচালনার অভিযোগ
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানিয়েছে, গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে খুলশী থানার ওয়্যারলেস কলোনির তালতলা এলাকায় হৃদয় নামে এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়।
ওই ঘটনার পর অভিযান চালিয়ে আট কিশোরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, দুই গ্যাংয়ের মধ্যে সম্প্রতি সিনিয়র-জুনিয়র নিয়ে বিরোধের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিহত হৃদয় ‘ফাইভ স্টার’ গ্যাংয়ের সদস্য ছিলেন। হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার আটজন ‘সেভেন স্টার’ গ্যাংয়ের সদস্য। পুলিশ আরও জানিয়েছে, ওয়াকিল হোসেন বগা ও রকিবুল ইসলাম ওরফে পিচ্চি ‘সেভেন স্টার’ গ্যাং পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় বিজয়, কামরান ও শান্তর নেতৃত্বে ‘ফাইভ স্টার’ গ্যাং পরিচালিত হয় বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ
গত ৩০ আগস্ট পাহাড়তলী ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক মিজানুর রহমানকে তুলে নিয়ে নির্যাতন এবং কলেজের অধ্যক্ষকে ভিডিওকলে রেখে হুমকি দেওয়ার ঘটনায় ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলায় সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়। এতে বগাকে ২ নম্বর আসামি করা হয়। অজ্ঞাতপরিচয় আরও চার থেকে পাঁচজনকেও আসামি করা হয়েছে।
এই মামলায় তাকে গ্রেফতারে গত ৪ সেপ্টেম্বর নগরের খুলশী থানাধীন ওয়্যারলেস এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। বগাকে গ্রেফতার করতে গেলে তার অনুসারীরা পুলিশের ওপর হামলা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সময় বগা বাসার একটি গোপন সুড়ঙ্গপথ দিয়ে পালিয়ে যান। এ ঘটনায় খুলশী থানার ওসি ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন এবং পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।
পুলিশের বিরুদ্ধে বগার বাবার মামলা
বগার বাসায় পুলিশ অভিযান চালানোর ঘটনায় গত ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মহিদুল ইসলামের আদালতে মামলা করেন তার ৬৬ বছর বয়সী বাবা জাবেদ।
মামলায় খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিম, এসআই শাহ পারভেজ, এসআই আনোয়ার হোসেন, বাবু মেম্বার ওরফে যুবলীগ বাবু, মিজানুর রহমান, আমান উল্লাহ আমান, সাংবাদিক আরিফ হোসেন ও আসাদ উল্লাহকে আসামি করা হয়। আদালত নালিশি মামলাটি আমলে নিয়ে অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, পুলিশ কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে তার বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর, লুটপাট, মারধর ও ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে।
বগা প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সহকারী কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশিদ বলেন, বগা একজন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে থানায় একাধিক মামলা আছে। মঙ্গলবার রাতে সিটি করপোরেশন ভবনে বগা আসতে পারে এমন তথ্যে সামনের সড়কে পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি শুরু করে। তাকে পাওয়া যায়নি। তবে তাকে গ্রেফতারে অভিযান চলমান আছে।