কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে স্কুলছাত্রীর (১৫) লাশ উদ্ধারের ঘটনার রহস্য উদঘাটনে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থলে পাওয়া সিএনজিচালিত অটোরিকশার সূত্র ধরে চট্টগ্রাম থেকে সুমন নামের এক চালককে আটক করা হয়েছে। তার সম্পৃক্ততা এবং এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত কিনা, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে লালমাইয়ের পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর গ্রামের ধানক্ষেত থেকে ওই ছাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়। তখন লাশের পাশেই একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। ওই ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছেন স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ। ময়নাতদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার রাতে তার লাশ যশোর সদর উপজেলার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে পরিবারে মাতম শুরু হয়। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন বাবা-মা। শুক্রবার সকাল ১০টায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
শুক্রবার দুপুরে স্থানীয় সাংবাদিকেরা ছবি তুলতে গেলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ছাত্রীর মা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘কী হবে ছবি তুলে? আমার কলিজার পাখিটা যখন চলে গেছে, এখন আর কিছু বলবো না।’ পরে তিনি বলেন, তার মেয়ে যে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল, সেই বান্ধবীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যার রহস্য উদঘাটন হতে পারে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হয় ওই ছাত্রী। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায়। সেখান থেকে কুমিল্লায় ফিরে কক্সবাজারে যায়। এরপর ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’ বাসে করে বুধবার রাত ১২টার দিকে কুমিল্লা নগরের হোটেল নুরজাহানে পৌঁছায়। সোয়া ১২টার দিকে হোটেল থেকে বেরিয়ে যায় ছাত্রী।
পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, এরপর তার বাসায় ফেরার কথা ছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার সকালে লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর উত্তরপাড়ার মানুমুড়া জঙ্গল-সংলগ্ন একটি ধানক্ষেত থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় লোকজন ও পুলিশের প্রশ্ন, পদুয়ার বাজারে নামার পর শহরের দিকে না গিয়ে কীভাবে ওই ছাত্রী লালমাইয়ের নির্জন ধানক্ষেতে পৌঁছালো? আর কারাই বা হত্যা করলো।
সন্দেহের কেন্দ্রে অটোরিকশা
লাশের পাশেই পাওয়া যায় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। এর ভেতরে ছিল ছাত্রীর একটি পোশাক। কাছাকাছি পড়ে ছিল তার ভ্যানিটি ব্যাগ। এসব আলামত ধরে তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অটোরিকশাটি ভাড়ায় নিয়ে চালাতেন সুমন। তার বাড়ি লালমাই সংলগ্ন জয়পুর এলাকায়। তিনি বেশিরভাগ সময় রাতে পদুয়ার বাজার ও আশপাশের এলাকায় যাত্রী পরিবহন করতেন। নিজের বাড়ি না থাকায় শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন।
ঘটনার পর থেকে সুমন আত্মগোপনে ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও মোবাইল ফোন না থাকায় অবস্থান শনাক্ত করতে পুলিশের সমস্যায় পড়তে হয়। পরে চট্টগ্রাম থেকে আজ সকালে তাকে আটক করা হয়। এর আগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার দুই নিকটাত্মীয়কেও হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে কুমিল্লায় আনা হয়েছে সন্ধ্যায়।
পুলিশ জানায়, সিএনজি অটোরিকশার চালককে কেন্দ্র করে তদন্ত এগোচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত কিনা এবং ছাত্রীর মোবাইল ফোনসহ অন্যান্য মালামাল কোথায়, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ কাজ করছে। হত্যায় জড়িত সন্দেহে একজনকে আটক করে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত পরে জানানো হবে।’
ধানক্ষেতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বৃহস্পতিবার সকালে সড়কের পাশে ধানক্ষেতে অটোরিকশাটি পড়ে থাকতে দেখে তাদের সন্দেহ হয়। পরে অটোরিকশা থেকে প্রায় ৩০ গজ দূরে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ এবং কিছুটা দূরে ছাত্রীর লাশ দেখতে পান তারা। আশপাশের ধানক্ষেতে গাছ এলোমেলো ও ভাঙাচোরা অবস্থায় ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘ধানক্ষেতডির ধানগাছ ভাঙাচোরা। ধস্তাধস্তির মতো চিহ্ন দেখলাম। মাইয়াডার মুখ-মাথা কাদায় ছিল আর গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। পরে এলাকার ২০-২৫ জন মিল্লা সিএনজিডা ধানক্ষেত থিকা রাস্তায় তুলছে। সিএনজির ভেতরে মাইয়াডার একটা জামাও পাইছে। তার বাপে দেইখ্যা কইছে, এই জামা তার মাইয়ার।’
কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, ‘ঘটনাস্থলের ধানক্ষেতজুড়ে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে। আলামত দেখে মনে হচ্ছে, জীবন বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করেছিল ওই ছাত্রী।’
বাবার মোবাইল ফোনে পাঠানো হয়েছিল লাইভ লোকেশন
পুলিশ জানিয়েছে, বুধবার বিকালে এক শিক্ষকের মাধ্যমে পরিবারকে জানায়, রাতে সে বাসায় ফিরবে। পরে রাত পৌনে ২টার দিকে বাবার মোবাইল ফোনে লালমাইয়ের লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়ার বার্তা দেয় সে। তবে বাবা ঘুমিয়ে থাকায় তখন বার্তাটি দেখতে পাননি। নিহত ছাত্রীর বাবা বলেন, ‘পরদিন সকালে মেসেজ দেখি। তারপর লাইভ লোকেশনে গিয়ে মেয়ের লাশ দেখতে পাই।’
তিনি বলেন, ‘এখন কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে চাই না। আমার মেয়ের সঙ্গে কী হয়েছে, কারা তাকে হত্যা করেছে, পুরো ঘটনা জানতে চাই। জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করার দাবি জানাই।’
এ ঘটনায় ছাত্রীর বাবা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে লালমাই থানায় মামলা করেছেন। পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, আটক সিএনজিচালককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।