কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে (১৫) হত্যার রহস্য উদঘাটনের কথা জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। তার দেখানো স্থান থেকে কিশোরীর ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে সুমন কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যার কথা স্বীকার করে। তবে পুলিশের এই বক্তব্যের পরও হত্যাকাণ্ড ঘিরে কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বুধবার রাতে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকা থেকে ৩০০ টাকা ভাড়ায় স্কুলছাত্রীকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে অটোরিকশায় তোলে সুমন। পরে লালমাইয়ের একটি ফসলি জমিতে নিয়ে তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।
গতকাল পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ওই দিন রাতে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় বাস থেকে নামে ওই ছাত্রী। এরপর তিশা বাস কাউন্টারের সামনে গিয়ে বাসায় ফেরার জন্য অটোরিকশা খুঁজছিল। একপর্যায়ে ৩০০ টাকা ভাড়া ঠিক করে সুমনের সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠে।
এখন প্রশ্ন হলো, বাড়ি ফেরার জন্য মাত্র ৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার কথা থাকলেও কিশোরীকে কেন ৩০ কিলোমিটার ঘুরিয়ে নির্জন ফসলের মাঠে নেওয়া হলো? এতটা পথ যাওয়ার সময় কী ঘটেছিল? অটোরিকশায় চালক ছাড়া অন্য কেউ ছিল কিনা? ঘটনাস্থলে কেন অটোরিকশা রেখে গিয়েছিল চালক? আইফোনের জন্য হত্যা করা হলে কেনই-বা সেই আইফোন জঙ্গলে রেখে যায় চালক? কিংবা এ ঘটনায় অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা, কখন কীভাবে লাইভ লোকেশন বাবার কাছে পাঠিয়েছিল কিশোরী? ওই কিশোরীর বান্ধবীর কোনও খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল কিনা—এসব প্রশ্নেরও চূড়ান্ত উত্তর পাওয়া যায়নি।
বিশেষ করে কিশোরীর পরিবার কয়েক বছর ধরে কুমিল্লায় বসবাস করছে। ফলে তার জেলার ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে ধারণা থাকার কথা। এরপরও বাড়ির দিকে না গিয়ে উল্টোপথে এত দূরে চলে যাওয়ার সময় সে কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শনিবার সকালে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া। ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘গ্রেফতার সুমনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এখনও ঘটনার তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কিনা, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।’
উল্টোপথে ৩০ কিলোমিটার
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, গত বুধবার দিবাগত রাতে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার নূরজাহান হোটেল সংলগ্ন তিশা বাস কাউন্টারের কাছে বাড়ি ফেরার জন্য অটোরিকশা খুঁজছিল কিশোরী। রাত সাড়ে ১২টার দিকে সে সুমনের অটোরিকশায় ওঠে। দরকষাকষির পর ৩০০ টাকায় তাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে রাজি হয় সুমন। কিন্তু বাড়ির পথে না গিয়ে উল্টো সড়ক ধরে নির্জন এলাকার দিকে যেতে থাকে চালক।
পদুয়ার বাজার থেকে কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকার দূরত্ব প্রায় ৮ কিলোমিটার। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুমন প্রথমে কুমিল্লা-চাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের বিজরা বাজারের দিকে যায়। পরে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়ক হয়ে লালমাইয়ের ভোরাজগৎপুরের একটি ফসলের মাঠের কাছে পৌঁছায়। পুরো পথের দূরত্ব অন্তত ৩০ কিলোমিটার। পুলিশের ভাষ্য, শর্টকাটের কথা বলে কিশোরীকে নির্জন পথে নেয় চালক, সেখানে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। তাহলে যে শর্টকাটের কথা বলা হয়েছিল, কিশোরী তা কী টের পায়নি?
এতটা পথ ঘুরিয়ে নেওয়ার সময় কী ঘটেছিল, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। দুটি আঞ্চলিক মহাসড়কেই রাতে যানবাহন চলাচল করে। কিছু স্থানে লোকজনের চলাচলও থাকে। এ পথে কিশোরী কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল, কোনও পর্যায়ে সাহায্য চাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল কিনা, তা স্পষ্ট নয়। তবে পুলিশের ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে সুমন দাবি করেছে, অটোরিকশা চলার সময় কিশোরী কোনও ‘প্রতিক্রিয়া’ দেখায়নি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, ‘পদুয়ার বাজার থেকে কিশোরীর বাসায় যেতে সর্বোচ্চ আধা ঘণ্টা লাগার কথা। অথচ তাকে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা ঘুরিয়ে ঘটনাস্থলে নেওয়া হয়। মেয়েটি যদি ঘটনাস্থলে বা এর আগে অন্তত ৯৯৯-এ কল দিতো, তাহলে হয়তো আমাদের এমন একটি মৃত্যু দেখতে হতো না।’
পুলিশের দাবি, নির্জন স্থানে পৌঁছানোর পর কিশোরী পালানোর চেষ্টা করলে সুমন তাকে আটকাতে ধস্তাধস্তি করে। পরে গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধর্ষণ করে বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করে। এরপর ধানক্ষেতে নিয়ে মুখ মাটির দিকে রেখে পা দিয়ে মাথা চেপে শ্বাসরোধে হত্যা করে। পরে সেখানে অটেরিকশা রেখে চলে যায়।
বাবাকে ‘লাইভ লোকেশন’ পাঠিয়েছিল কিশোরী
পুলিশ জানিয়েছে, রাত ২টা ৫৮ মিনিটে কিশোরী তার বাবাকে ‘লাইভ লোকেশন’ পাঠিয়েছিল। ঘুমিয়ে থাকায় বাবা তখন সেটি দেখেননি। ভোরের দিকে লোকেশন দেখে মেয়েকে খুঁজতে বের হন। এর মধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করেছিল। পরে সেখানে গিয়ে মেয়ের মরদেহ শনাক্ত করেন বাবা।
কিশোরী কী পরিস্থিতিতে বাবাকে লাইভ লোকেশন পাঠিয়েছিল, সে সময় সে বিপদের আশঙ্কা করছিল কিনা এবং লোকেশন পাঠানোর পর কী ঘটেছিল—এসব বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হয়নি। তবে লোকেশন পাঠানোর সময় পর্যন্ত ফোনটি তার কাছে ছিল বলে ধারণা পাওয়া যায়।
সিসিটিভি ফুটেজে কিশোরী
ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে সুমন তা স্বীকার করেছে। তবে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হতে ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ধর্ষণ হত্যার আগে, নাকি পরে ঘটেছে, সে বিষয়েও পুলিশ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেনি।
ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজে কিশোরীকে অটোরিকশায় বসে থাকতে দেখা গেছে। ফুটেজে তাকে পেছনের বাঁ পাশে বসে থাকতে দেখা যায়। অটোরিকশায় অন্য কেউ ছিলেন কিনা তা নিয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন তোলেন। পুলিশ জানায়, এখন পর্যন্ত সুমন ছাড়া অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।
পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, বান্ধবীর কাছে যাওয়ার কথা বলে ৪ অক্টোবর বাসা থেকে বের হয়েছিল কিশোরী। পরে তার ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। কক্সবাজার থেকে আইকনিক এক্সপ্রেসের একটি বাসে বুধবার দিবাগত রাতে কুমিল্লায় এসে নেমেছিল।
রাত পৌনে ১২টার দিকে পদুয়ার বাজার এলাকার নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামে কিশোরী। এরপর একটি দোকানে মোবাইল ফোন চার্জ দেয়। রাত সোয়া ১২টার দিকে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে যায়। পরে বাড়ি ফেরার জন্য অটোরিকশায় ওঠে।
৪ থেকে ৭ অক্টোবর রাত পর্যন্ত কিশোরী কীভাবে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও সামনে আসেনি। পুলিশ জানিয়েছে, ওই চার দিনে পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনও সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়নি। ঘটনার পর কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস বলেছিলেন, কিশোরী বুধবার রাতে বাসায় ফিরবে বলে ওই দিন বিকালে পরিবারকে জানিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বাসায় ফিরেনি।
ফোনটি জঙ্গলে রেখে চট্টগ্রামে পালায় সুমন
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর অটোরিকশাটি ঘটনাস্থলে ফেলে কিশোরীর আইফোন নিয়ে চলে যায় সুমন। পরে কচিকাটা মসজিদের কাছে একটি পুকুরে গোসল করে। এরপর অন্য একটি অটোরিকশায় বাখরাবাদ এলাকায় গিয়ে পুকুরপাড়ের জঙ্গলে ফোনটি লুকিয়ে রাখে। পরে চট্টগ্রামে চলে যায়।
গত শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেফতার করা হয়। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একই দিন বাখরাবাদ থেকে আইফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ। ফোনটির বিষয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
মহাসড়কে রাতের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড থেকে বাড়ি ফেরার পথে কিশোরীর সঙ্গে এ ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশের বক্তব্য। ফলে রাতে মহাসড়ক ও আশপাশের সড়কে যাত্রীদের নিরাপত্তা এবং পুলিশের টহল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এর আগে গত ২৪ এপ্রিল রাতে কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীও বাস থেকে নামার পর সংঘবদ্ধ সিএনজিচালিত অটোরিকশা চক্রের ফাঁদে পড়েছিলেন। ছিনতাইয়ের পর তাকে হত্যা করা হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, ‘অতীতের ঘটনাগুলোতেও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনেছে পুলিশ। কিশোরী হত্যার পরও দ্রুত সময়ে আসামিকে গ্রেফতার করা হয়।’
বান্ধবীর ভূমিকা নিয়ে মায়ের সন্দেহ
এদিকে কিশোরীর মা মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় তার এক বান্ধবীর ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। শুক্রবার যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের বাড়িতে তিনি বলেছিলেন, বুধবার বিকালে মেয়ে তাকে জানিয়েছিল, বান্ধবীর সঙ্গে আছে। বান্ধবীর নাম এবং তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও মেয়ে কিছু বলেনি। ওই বান্ধবীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
এসব প্রশ্নের বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, ‘ঘটনাটি নিয়ে আমাদের তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বাকি প্রশ্নগুলোর উত্তর তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করা হবে।’