ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সারের ডিলারশিপ নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতির ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি নাসিরনগরের ১৩টি ইউনিয়নের সারের ডিলারশিপের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তালিকায় দেখা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের ছেলে, ভগ্নিপতি ও ভাগনে-বউয়ের নাম এসেছে। এ নিয়ে জেলাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন স্থানীয় লোকজন ও ডিলারশিপ প্রত্যাশী ব্যক্তিরা।
গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ডিলারশিপের তালিকা প্রকাশের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।
ডিলারশিপের তালিকা দেখে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাসিরনগর উপজেলার গোকর্ণ ইউনিয়ন থেকে এমপি হান্নানের ছেলে আদনান সাদী মেসার্স আলীয়াহ ট্রেডার্স নামে, নাসিরনগর সদর ইউনিয়ন থেকে এমপির আপন ভগ্নিপতি আরক মিয়া মেসার্স আয়ান ট্রেডার্স নামে এবং গোয়ালনগর ইউনিয়ন থেকে এমপির আপন ভাগনে শরীফের স্ত্রী নুরুন্নাহার আক্তার স্বর্ণা এস এস ট্রেডার্স নামে সারের ডিলারশিপ পেয়েছেন।
এমপির ছেলে ও আত্মীয়-স্বজনের সারের ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসনও। তবে এ নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি উপজেলা প্রশাসনের কোনও কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে জানতে সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার পরও ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, জেলার ১০১টি ইউনিয়ন ও ৫ পৌরসভায় ১০৬টি সারের ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেন ৮২৫ জন। সেখান থেকে সার ডিলার-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে ২৯২ জনের আবেদন সুপারিশ করে পাঠানো হয়। প্রত্যেক ইউনিয়নের ডিলারের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিন জনের নাম সুপারিশ করে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি।
এর আগে সেপ্টেম্বরে ওই জেলা কমিটি ডিলার নিয়োগে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। জেলায় জমা হওয়া ডিলারের আবেদন উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির কাছে পাঠানো হয় যাচাই-বাছাই করতে। তারা যাচাই-বাছাই করে তিন জনের নাম পাঠায়। সে সময় তালিকায় তিন জনের মধ্যে এক নম্বরে নাম দেওয়া নিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা-পয়সা লেনদেন হওয়ারও অভিযোগ ওঠে।
ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. মোস্তফা এমরান বলেন, ‘উপজেলা থেকে প্রত্যেক ইউনিয়নের জন্য যে নাম এসেছে, সেগুলোই সুপারিশ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি আমরা। এর মধ্যে দুই-একটি এদিক-সেদিক হয়েছে।’
ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার জন্য টাকা লেনদেনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এটি করিনি বা অন্য কেউ করেছে এমন অভিযোগ আমার জানা নেই। উপজেলায় তালিকার ব্যাপারে হয়তো হস্তক্ষেপ থাকতে পারে। ডিলার তালিকা প্রকাশের পর জেলা প্রশাসকের কাছে কিছু অভিযোগ জমা হয়েছে বলেও শুনেছি।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবুসাঈদ রবিবার বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডিলার নিয়োগে অনিয়মের বিষয়ে এখন পর্যন্ত চারটি অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালকের সঙ্গে আজ আমার কথা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের স্টাফদের কারণে তালিকায় একটি নাম ভুল হয়েছে। বাকিগুলো আসলে ভুল হয়নি। বাকিগুলো নিয়ে এলাকাভিত্তিক। যারা ডিলারশিপ পাননি তারা হয়তো একটু অসন্তুষ্ট আছেন।’
এমপির ছেলে, ভগ্নিপতি ও ভাগনের বউয়ের ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এটা আসলে আমাদের বিষয় না। উপজেলা কমিটি যাদের যোগ্য মনে করছে তাদের মনোনীত করেছে। হয়তো ঘুরেফিরে এমপির স্বজনরা তালিকায় আছেন। এ ব্যাপারে আসলে জেনেশুনে কিছু করা হয়নি। যাদের যোগ্য মনে হয়েছে কমিটির তাদের তালিকা পাঠানো হয়েছে। এখন যদি কমিটির সবাই তাদের যোগ্য মনে করে তাহলে তো আমাদের পক্ষ থেকে কিছু বলার নেই। অন্য জায়গায় তো এরকম হয়নি।’