কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে (১৫) ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন কথিত প্রেমিক রিয়াজ উদ্দিন রাজুকে কক্সবাজার থেকে আটক করেছিল পুলিশ। সোমবার (১২ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লা ডিবির টিম কক্সবাজার পৌঁছে সদর থানা পুলিশের কাছ থেকে তাকে নিজেদের হেফাজতেও নিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে না নিয়ে এসে কক্সবাজার সদর থানায় রেখেই কুমিল্লায় ফিরলো ডিবি। সন্ধ্যায় বিষয়টি বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও মিডিয়া বিভাগের মুখপাত্র লুৎফর রহমান।
কেন তাকে রেখে খালি হাতে কুমিল্লায় ফিরলো ডিবি জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় রাজুর সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় কুমিল্লায় আনা হয়নি। রাজুকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল, এতে তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। তবে ওই ছাত্রীর সঙ্গে তার পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে স্বীকার করেছে। সেখান থেকে ফেরার পর তার সংশ্লিষ্টতা নেই।’
এর আগে রবিবার রাত ৯টার দিকে কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকার হোটেল-মোটেল জোন সংলগ্ন চন্দ্রিমা উদ্যান এলাকা থেকে রাজুকে আটক করে পুলিশ। ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে ছাত্রীকে ঘর ছাড়তে বাধ্য এবং হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য প্রেক্ষাপট তৈরিতে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে আটক করা হয়েছিল।
পুলিশ ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করেন রাজু। ফেসবুকে ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে তার পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। রাজুর ডাকে সাড়া দিয়েই কিশোরী বাড়ি থেকে বের হয়ে কক্সবাজারে যায়। সেখানে হোটেলে ‘স্বামী-স্ত্রী’ পরিচয়ে থাকে।
গত বুধবার কক্সবাজার থেকে বাসে করে কিশোরী কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয়। ওই রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার হোটেল নূরজাহানের সামনে নেমে শহরের রেসকোর্সের বাসায় ফিরতে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে। পথিমধ্যে অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়া তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ করে এবং পরবর্তীতে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে বলে জানায় পুলিশ। ঘটনার পরদিন সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের ধানক্ষেত থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। তবে ছাত্রীকে ঘর ছাড়তে প্ররোচিত করা এবং তাকে কক্সবাজারে নিয়ে যাওয়ার পেছনে রাজুর ভূমিকা ও অন্য কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে জানতে রবিবার রাতে রাজুকে আটক করে পুলিশ।
সোমবার সকালে রাজুকে গ্রহণ করতে কক্সবাজারে যায় কুমিল্লা ডিবির উপপরিদর্শক পবিত্র সরকারের নেতৃত্বে একটি দল। এ সময় রাজুকে কক্সবাজার সদর থানা থেকে বের করে ডিবি পুলিশের একটি গাড়িতে উঠাতে দেখা যায়। সেইসঙ্গে তাকে গ্রহণের পর ফটোসেশন করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের দলটি।
সন্ধ্যায় কুমিল্লা ডিবি পুলিশ জানায়, রাজুকে কুমিল্লায় আনা হয়নি। কক্সবাজার সদর থানার ডিউটি অফিসারের কক্ষে রেখে চলে এসেছে ডিবি পুলিশের দল।
তবে ডিবির উপপরিদর্শক পবিত্র সরকারের স্বাক্ষরিত রাজুকে গ্রহণ করার একটি চিঠি এই রিপোর্টারের হাতে এসেছে। কক্সবাজার সদর থানার ওসি বরাবর লেখা ওই চিঠিতে বলা হয়, কুমিল্লার লালমাই থানার মামলা নং-৪, তারিখ-০৮ অক্টোবর, ২০২৬; জি আর নং-১১৮, ধারা-৩০২/৩০২/৩৪ পেনাল কোড-১৮৬০। যথাবিহীত সম্মানপূর্বক বিনীত নিবেদন এই যে, আমি নিম্ন স্বাক্ষরকারী পবিত্র সরকার, সাব-ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র), এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। এটি চাঞ্চল্যকর মামলা। তদন্তকালে ভিকটিমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বরের কললিস্ট ও প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় জানা যায়, ঘটনার আনুমানিক দুদিন আগে ভিকটিম কক্সবাজার সদর থানা এলাকায় অবস্থান করেছিল। আপনার থানা কর্তৃক আটককৃত রিয়াজ উদ্দিন রাজুর সঙ্গে তার দেখা-সাক্ষাৎ হয়। এ ছাড়াও ঘটনার পূর্বে ভিকটিমের সঙ্গে আটককৃত ব্যক্তির একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের তথ্য পাওয়া যায়। এ অবস্থায়, ভিকটিমের সঙ্গে আটককৃত রাজুর পূর্বপরিচয় বা সম্পর্কের প্রকৃতি, ঘটনার পূর্বে তাদের মধ্যে যোগাযোগের কারণ, তথ্য-উপাত্তসহ মামলার ঘটনা সম্পর্কে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে কি না, তা উদঘাটনের জন্য ওই ব্যক্তিকে গ্রেফতার পূর্বক জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।’
‘অতএব, মহোদয়ের নিকট বিনীত প্রার্থনা, মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে আটক রাজুকে আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণপূর্বক গ্রেফতারের নিমিত্তে হস্তান্তরসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আপনার সদয় মর্জি হয়’ বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
সন্ধ্যায় এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্কুলছাত্রী হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতা না থাকায় রাজুকে গ্রহণ করেনি কুমিল্লা ডিবি পুলিশ। তাকে কক্সবাজার সদর থানায় রেখে কুমিল্লায় ফিরে এসেছে ডিবি।’
কক্সবাজার সদর থানা পুলিশের কাছ থেকে সকালে ওই আসামিকে গ্রহণ করা হয়েছে মর্মে একটি চিঠি আমার হাতে আছে জানালে তিনি বলেন, ‘আমরা আসামিকে গ্রহণ করিনি। ওই থানায় আছে আসামি।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস) মো. অহিদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাকে দুপুরে কক্সবাজার সদর থানার ওসি প্রাথমিকভাবে জানিয়েছিলেন আসামিকে নিয়ে গেছে কুমিল্লা ডিবি। পরে শুনলাম তারা নেয়নি। তারা আসামিকে সদর থানার ডিউটি অফিসারের কক্ষে রেখে চলে গেছে।’
অহিদুর রহমান আরও বলেন, ‘তারা বলেছে ঘটনায় রাজুর সংশ্লিষ্টতা পায়নি, এজন্য কুমিল্লায় না নিয়ে রেখে গেছে। পরে কক্সবাজার জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে রাজুকে ৬৪ ধারায় আদালতে চালান দেওয়া হয়েছে। বিকালে তাকে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।’
৬৪ ধারায় আদালতে চালান ও কারাগারে পাঠানোর কারণ জানতে চাইলে অহিদুর রহমান বলেন, ‘যেহেতু একটি ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড ঘটেছে; ওই ছাত্রী প্রথমে রাজুর সঙ্গে কক্সবাজারে হোটেলে উঠেছিল, বাড়ি ফেরার পথে ঘটনাটি ঘটেছে সেহেতু ঘটনায় অবশ্যই রাজুর কোনও না কোনও ভাবে সংশ্লিষ্টতা আছে। সেজন্য আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় তাকে অবশ্যই আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’