সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড: নজরুলের বাবা-মায়ের একটাই চাওয়া এখন

দীর্ঘ ২৪ বছর সৌদি আরবে থেকেও পরিবারের ভাগ্য ফেরাতে পারেননি আবদুল বাছির। ২০২০ সালে দেশে ফিরে শুরু করেন কৃষিকাজ। সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর বড় ছেলে নজরুল ইসলামকে (২২) পাঠান সৌদি আরবে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার আট মাসের মাথায় গ্রেফতার হন নজরুল। ঋণের সাড়ে চার লাখ টাকা তখনও পরিশোধ করা বাকি।

এরপর কেটে গেছে প্রায় তিন বছর। কারাগারে থাকা ছেলের সঙ্গে মাঝেমধ্যে ফোনে কথা বলতে পারতেন বাবা-মা। সর্বশেষ কথা হয়েছিল গত ১১ অক্টোবর। দুই থেকে আড়াই মিনিটের সেই কথোপকথনের পর আর ছেলের কণ্ঠ শোনা হয়নি তাদের। গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সৌদি আরব থেকে ফোন করে পরিবারকে জানানো হয়, নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

খবরটি শোনার পর থেকে ভেঙে পড়েছেন বাবা আবদুল বাছির ও মা রহিমা বেগম। তাদের কাছে এখন একটাই চাওয়া—সৌদি আরব থেকে ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হোক, শেষবারের মতো যেন তার মুখ দেখতে পারেন তারা।

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কাজের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে গত বুধবার এ তথ্য জানায় সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ)। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুজন হলেন নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার।

ঋণের বোঝা, স্বপ্নভাঙা পরিবার

নজরুলের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার একটি গ্রামে। কৃষক আবদুল বাছির ও রহিমা বেগমের দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে নজরুল সবার বড়। ২০২০ সালে একটি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করার পর সদর উপজেলার একটি কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি।

নজরুলের বাবা আবদুল বাছির দীর্ঘ ২৪ বছর সৌদি আরবে ছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ প্রবাসজীবনেও পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা আসেনি। দেশে ফিরে কৃষিকাজ শুরু করেন তিনি। সংসারের অভাব দূর করার আশায় ছয় লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে বিদেশে পাঠান। সৌদি আরবে যাওয়ার পর প্রথম সাত-আট মাসে নজরুল প্রায় দেড় লাখ টাকা পাঠিয়েছিলেন। এরপর গ্রেফতার হয়ে কারাগারে চলে যাওয়ায় পরিবারের আয়ের সেই আশাও থেমে যায়। ঋণের বড় অংশ থেকে যায় অপরিশোধিত।

নজরুলের ছোট ভাইয়ের বয়স ১৪ বছর। সে স্থানীয় একটি দাখিল মাদ্রাসায় পড়ে। দুই বোনের একজনের বয়স নয় বছর; সে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। ছোট বোনের বয়স চার বছর। পরিবারের বড় ছেলেকে হারানোর শোকের পাশাপাশি এখন তাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তায় স্বজনেরা।

খবর শুনে মারা গেলেন ফুফু

পরিবারের সদস্যরা জানান, পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন নজরুল। দেশটিতে যাওয়ার আট মাসের মাথায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের প্রায় এক মাস পর বিষয়টি জানতে পারে পরিবার। এরপর থেকে তিনি সৌদি আরবের কারাগারে ছিলেন। মাঝেমধ্যে বাবা-মায়ের সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলার সুযোগ পেতেন নজরুল। ১১ অক্টোবর তাদের সঙ্গে তার সর্বশেষ কথা হয়। এরপর গত বুধবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পেয়ে শোকে ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। স্বজনেরা জানান, খবরটি শোনার পর নজরুলের ফুফু আবেদা বেগম (৬৫) মূর্ছা যান। ওই দিন রাত ২টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন স্বজন ও বন্ধুদের

নজরুলকে বিনয়ী ও ভদ্র হিসেবেই জানেন আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুরা। সৌদি আরবে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তার স্বভাবের সঙ্গে মেলে না বলে দাবি তাদের। এ ঘটনার পেছনে ষড়যন্ত্র থাকতে পারে বলেও মনে করেন তারা।

নজরুলের দূরসম্পর্কের দুই চাচাতো ভাই মোস্তাকিম ভূঁইয়া ও ইমাম হাসান ভূঁইয়া জানান, সৌদি আরবে পরিচ্ছন্নতার কাজ করার সময় এক ব্যক্তির সঙ্গে নজরুলের বিরোধ তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি তিনি ফোনে তার বাবা-মাকেও জানিয়েছিলেন। ওই ব্যক্তি পাকিস্তানের নাগরিক বলে নজরুল তাদের জানিয়েছিলেন। সেই ব্যক্তির ষড়যন্ত্রের কারণেই নজরুলের এমন পরিণতি হয়েছে বলে মনে করেন তারা।

নজরুলের বন্ধু রাহাত ভূঁইয়া বলেন, সৌদি আরবে নজরুলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি এ ধরনের কাজ করেছেন—এ কথা বিশ্বাস করতে পারছেন না।

নজরুল যে দাখিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছিলেন, সেই মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট মাওলানা নাঈমুর রহমান বলেন, নজরুলের আচার-আচরণ ও চলাফেরা ভালো ছিল। দেশে থাকতে তার মধ্যে খারাপ কোনও আচরণ দেখেননি তিনি।

শেষবারের মতো ছেলের মুখ দেখতে চান মা-বাবা

নজরুলদের বাড়িতে গিয়ে তার বাবা আবদুল বাছিরের সঙ্গে কথা বলার সময় বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। আবদুল বাছির বলেন, ‘আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছি। প্রথম সাত-আট মাসে ছেলে প্রায় দেড় লাখ টাকা পাঠিয়েছিল। এরপর তিন বছর ধরে ছেলে সে দেশের কারাগারে ছিল। ছেলের মৃত্যুদণ্ডের খবর শোনার পর আমার বোনও হৃদরোগে মারা গেছে।’ 

তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে কী করেছে আমি জানি না। একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। আমি আমার ছেলের মরদেহ দেশের মাটিতে ফিরে পেতে চাই। এখন আর কোনও চাওয়া নেই—শুধু ছেলের মরদেহ একবার দেখতে চাই। এটাই শেষ চাওয়া আমার।’

ছেলেকে হারানোর শোকে গত কয়েক দিন ধরে কাঁদছেন মা রহিমা বেগম। তিনি বলেন, ‘ছেলেই এক মাস পরপর ফোন করতো। এক থেকে দুই মিনিট কথা বলতো। আমার ছেলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা মিথ্যা। আমি শেষবারের মতো ছেলের লাশ দেখতে চাই।’

ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর যে স্বপ্ন দেখেছিলেন আবদুল বাছির, তা আজ পরিণত হয়েছে গভীর শোক আর অনিশ্চয়তায়। ছেলের মরদেহ দেশে ফিরবে কিনা, সেই অপেক্ষাতেই দিন কাটছে পরিবারের।