কক্সবাজারে ১০ পর্যটকের মৃত্যু: রিসোর্টের মালিক দুজন, আসামি কেন একজন?

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের করা মামলায় রিসোর্টের দুই মালিকের মধ্যে একজনের নাম থাকলেও অন্যজনের নাম নেই। রিসোর্টের ওয়েবসাইটে দুই ব্যক্তিকে মালিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া হলেও মামলায় একজনকে আসামি করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে মামলায় কোন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে এবং আসামি নির্বাচনের ভিত্তি কী, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন একজন আইনজীবী।

রিসোর্টটির ওয়েবসাইটে মালিক হিসেবে তানভীর সুলতান মিয়া ও নিয়াজ মোর্শেদের নাম রয়েছে। তবে উখিয়া থানায় দায়ের করা মামলায় তানভীর সুলতান মিয়ার নাম থাকলেও নিয়াজ মোর্শেদের নাম নেই। মামলায় রিসোর্টের কয়েকজন কর্মচারীকেও আসামি করা হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা আদালতের আইনজীবী সেজান এহসান বলেন, ‘মালিকদের মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হলেও অন্যজনের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। মামলায় আসামি নির্বাচন ও অভিযোগের ধারাগুলো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিষয়গুলোতে পুলিশের গাফিলতি আছে।’ 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, ‌‘প্রথমে একজন মালিকের নাম পাওয়ায় তাকে আসামি করা হয়েছে। এখন আরেকজনের নাম সামনে আসছে। আরও নাম পাওয়া গেলে সেগুলো মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আমরা ঘটনার তদন্ত করছি। এখনও তদন্ত শেষ হয়নি।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রিসোর্টটির সাবেক এক কর্মী জানান, মামলার চার নম্বর আসামি ও গ্রেফতার হওয়া ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমনের বাড়ির পাশে নিয়াজ মোর্শেদের বাড়ি বলে তিনি শুনেছেন। নিয়াজ চট্টগ্রামে ইন্টারনেটের ব্যবসা করেন বলেও শুনেছেন তিনি। এর বাইরে নিয়াজ সম্পর্কে তার জানা নেই। গ্রেফতার সুমনের বাড়ি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি গ্রামে।

নিয়াজ মোর্শেদের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক রিমন ঘোষ বলেন, ‘তদন্ত চলছে, এখনই কিছু বলা যাবে না। তদন্তে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাদের আসামি করা হবে।’

পুলিশ জানিয়েছে, মামলায় চারজনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন ব্যবস্থাপককে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদের অবস্থান ও ভূমিকা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ। মামলায় অবহেলাজনিত মৃত্যু ও গুরুতর আঘাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। 

তবে রিসোর্টের ওয়েবসাইটে মালিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া দুজনের মধ্যে একজনের নাম মামলায় কীভাবে এসেছে, অন্যজনের নাম কীভাবে বাদ পড়েছে এবং প্রত্যেকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী—এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ জবাব দেয়নি পুলিশ।

ওয়েবসাইটে দুই মালিক, এজাহারে একজন

রিসোর্টটির ওয়েবসাইটের ‘অ্যাবাউট’ অংশে তানভীর সুলতান মিয়া ও নিয়াজ মোর্শেদের ছবি ও নাম রয়েছে। সেখানে তাদের ‘ওনার্স’ বা মালিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। ওয়েবসাইটে তাদের যৌথভাবে অতিথিদের স্বাগত জানানোর বক্তব্যও রয়েছে। অন্যদিকে, মামলার এজাহার-সংক্রান্ত তথ্যে রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী হিসেবে মো. তানভীর সুলতান মিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রধান ব্যবস্থাপক সাঈদ আহাম্মেদ, ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাঈদ এবং সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমনের নাম আছে।

মামলার এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর উখিয়া থানায় মামলাটি করা হয়। এতে দণ্ডবিধির ৩০৪এ, ৩৩৮ ও ৩৪ ধারা উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার বাদী উখিয়া থানার উপপরিদর্শক আশিষ সূত্রধর। মামলাটির তদন্ত করছেন উপপরিদর্শক রিমন ঘোষ।

উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান বলেন, ‘প্রথমে আমরা একজনের নাম পেয়েছি, এখন আরেকজনের নাম আসছে। আরও নাম পাওয়া গেলে সেগুলো মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’

রিসোর্টের অন্য মালিকের ঠিকানা জানতে চাইলে ওসি তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি। গ্রেফতার ব্যবস্থাপক সুমনকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে আরও তথ্য পাওয়া যাবে।

ওসি আরও বলেন, অগ্নিকাণ্ডে রিসোর্টের কাগজপত্র পুড়ে যাওয়ায় ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন নথি সংগ্রহে সমস্যা হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জায়গা থেকে নথি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।

মামলা ও অভিযোগের ধারা নিয়ে প্রশ্ন

মামলার এজাহার পর্যালোচনা করে আসামি নির্বাচন ও অভিযোগের ধারা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবী সেজান এহসান। তার ভাষ্যমতে, ঘটনাটিকে শুধু অবহেলাজনিত মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা যথেষ্ট কি না, তা আরও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তিনি বলেন, রিসোর্ট নির্মাণ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল কি না এবং পরিবেশগত বিধি মানা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের কেন্দ্রে থাকা উচিত।

তিনি বলেন, ‘এত মানুষের মৃত্যুর পরও এজাহারে মালিকদের ভূমিকা ও কর্মীদের দায় নির্ধারণের বিষয়টি যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। এজাহার দেখে আমার মনে হয়েছে, কর্মীদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে আসামি করা হয়ে থাকতে পারে। অন্যদিকে, মালিকদের একজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট নয়। তদন্তে প্রকৃত দায়িত্ব নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’

মামলায় দণ্ডবিধির ৩০৪এ ধারায় অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যু ঘটানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। গুরুতর আঘাতের অভিযোগে রয়েছে ৩৩৮ ধারা। একাধিক ব্যক্তির অভিন্ন অভিপ্রায়ে অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ৩৪ ধারাও উল্লেখ করা হয়েছে।

আইনজীবী সেজান এহসান বলেন, ‘দণ্ডবিধির ৩০৪এ ধারায় এমন বেপরোয়া বা অবহেলামূলক কাজের কারণে মৃত্যু ঘটানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত, যা অপরাধমূলক নরহত্যার পর্যায়ে পড়ে না। অন্যদিকে, ৩০৪ ধারায় অপরাধমূলক নরহত্যার জন্য আলাদা শর্ত রয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যুর অভিপ্রায় বা মৃত্যু ঘটতে পারে—এমন জ্ঞান থাকার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।’

শনিবার সকালে উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগার পর সেখান থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১১ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানিয়েছে প্রশাসন।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মরদেহগুলো এতটাই পুড়ে গেছে যে ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন। ডিএনএ পরীক্ষার ফল পেতে কিছুদিন সময় লাগবে।’

পুলিশ, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন ও স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত ১০ জনের মধ্যে ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ রয়েছেন। বাকি ব্যক্তিদের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।