পর্যটনদের নিরাপত্তা কোথায়?

কক্সবাজারে ঘুরতে এসে নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হবে, কখনও ভাবিনি

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। দেশের পর্যটনশিল্পের প্রাণকেন্দ্র এবং বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম চালিকাশক্তি এই পর্যটন নগরী। প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে লাখো পর্যটক এখানে বেড়াতে আসেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ইনানীর একটি রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু এবং এর দুই দিনের মাথায় হিমছড়ি সৈকতে গোসল করতে নেমে একই পরিবারের সদস্যসহ চার পর্যটকের প্রাণহানির ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কতটা প্রস্তুত কক্সবাজার।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা, দুর্বল তদারকি এবং নিরাপত্তাবিধি বাস্তবায়নে গাফিলতির কারণে বারবার এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন গন্তব্য কক্সবাজারের প্রতি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আস্থা কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।

পর্যটনশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী, স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে কক্সবাজারে দ্রুত গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন পথ, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং নিয়মিত নিরাপত্তা মহড়ার ঘাটতি রয়েছে। কোথাও কোথাও ভবন নির্মাণ, পরিবেশগত অনুমোদন ও মান নিয়ন্ত্রণ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

শুধু আবাসন খাত নয়, সমুদ্রসৈকতের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। অভিযোগ রয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, পর্যাপ্ত লাইফগার্ড, আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম ও কার্যকর নজরদারির ঘাটতি রয়েছে। ফলে প্রায় প্রতিবছরই সাগরে গোসল করতে নেমে প্রাণ হারান পর্যটকেরা।

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন পর্যটকেরা

ঢাকার মিরপুর থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা পর্যটক দম্পতি সাজেদুল আলম ও সামিহা আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কক্সবাজারে ঘুরতে এসে নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হবে, এটা কখনও ভাবিনি। পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা মানুষ যেন নিশ্চিন্তে ঘুরে যেতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।’

সিলেট থেকে আসা পর্যটক শামীম চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিবারই কোনও না কোনও দুর্ঘটনার খবর শুনতে হয়। দুর্ঘটনা ঘটার পর অভিযান হয়, কিন্তু কিছুদিন পর সব আগের মতো হয়ে যায়। এই সংস্কৃতি থেকে বের হতে হবে। যেহেতু প্রতি বছর এখানে এত পর্যটক আসছেন, সেহেতু সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।’

রাজশাহী থেকে আসা নারী পর্যটক জয়া, নিহা ও ইয়াসমিন বলেন, সৈকতের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো আরও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি রিসোর্টগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা বাধ্যতামূলকভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তদন্ত হয়, বদলায় না নিরাপত্তাব্যবস্থা

কক্সবাজারের সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলেও তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ, সুপারিশ বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি খুব কম। ফলে একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে।

বাংলাদেশ সুজনের কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি মো. মাহবুবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুর্ঘটনা ঘটার পর নয়, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নিয়মিত তদারকি ও আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপত্তাবিধি অমান্যকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।’

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) সভাপতি আনোয়ার কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কক্সবাজারের পর্যটনশিল্প দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তাহীনতার কারণে পর্যটকদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হলে তার প্রভাব পুরো পর্যটনশিল্পের ওপর পড়বে। তাই সরকারি-বেসরকারি সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’

সমন্বয়হীনতার কথা স্বীকার কউকের

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও (কউক) পর্যটন ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতার বিষয়টি স্বীকার করেছে। কউকের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফজলে রাব্বি বলেছেন, ‘২০২৩ সাল থেকে নিয়মবহির্ভূত স্থাপনা ও নিরাপত্তার ঘাটতি নিয়ে একের পর এক নোটিশ দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি রাতের অন্ধকারে নতুন হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট গড়ে ওঠার ঘটনাও ঘটছে, যা নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’

নিরাপদ পর্যটন গন্তব্য গড়ার তাগিদ

পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপদ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে প্রতিটি হোটেল ও রিসোর্টে বাধ্যতামূলক অগ্নিনিরাপত্তা নিরীক্ষা, নিয়মিত মহড়া, আধুনিক অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা, কার্যকর জরুরি বহির্গমন পথ এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে সমুদ্রসৈকতে লাইফগার্ডের সংখ্যা বাড়ানো, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বৈজ্ঞানিকভাবে চিহ্নিত করা, ড্রোনভিত্তিক নজরদারি, আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম সংযোজন এবং পর্যটকদের জন্য কার্যকর সতর্কীকরণব্যবস্থা চালুর ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কক্সবাজার শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও পর্যটন অর্থনীতির অন্যতম প্রতীক। তাই প্রতিটি দুর্ঘটনার পর শুধু শোক প্রকাশ বা তদন্ত কমিটি গঠন নয়, নিরাপত্তাব্যবস্থায় স্থায়ী ও দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হবে। অন্যথায় একের পর এক প্রাণহানি শুধু স্বজন হারানোর বেদনাই বাড়াবে না, দেশের পর্যটনশিল্পের প্রতিও মানুষের আস্থাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।