সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি যুবক ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নজরুল ইসলামের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম সিরাজ। রবিবার (২৫ অক্টোবর) সকালে তিনি সদর উপজেলায় নজরুলের বাড়িতে যান। সেখানে শোকাহত তার মা-বাবার সঙ্গে কথা বলে পরিবারের খোঁজখবর নেন। এ সময় নজরুলের মা-বাবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন। তারা রাষ্ট্রীয় খরচে ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।
নজরুলের মা রহিমা বেগম জানান, ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। কিন্তু সৌদি আরবে যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় একটি ঘটনায় ছেলেকে কারাগারে যেতে হয়। কারাগারে থাকার সময়ও প্রতি রবিবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতো নজরুল। হঠাৎ পরিবারের কাউকে না জানিয়ে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান রহিমা বেগম।
নিহত নজরুলের বাবা আবদুল বাছির বলেন, ‘পরিবারের সচ্ছলতার আশায় ধারদেনা করে বড় ছেলে নজরুলকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলাম। সেখানে মক্কা শহরের একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতো নজরুল। পরে তার বিরুদ্ধে নারী সংক্রান্ত অভিযোগ আনা হয় এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।’
আবদুল বাছির বলেন, ‘তার অপরাধ কী ছিল, পরিবারের সদস্য হিসেবে আমরা এখনও স্পষ্টভাবে জানি না। অপরাধ করে থাকলে গ্রেফতার করে দেশে পাঠিয়ে দিতে পারতো। বাংলাদেশ সরকার তার বিচার নিশ্চিত করতে পারতো। কিন্তু পরিবার এমনকি বাবা-মাকেও না জানিয়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে সৌদি সরকার।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে আমাকে কিছু জানানো হয়নি। পরিবারের খোঁজ নিতেও কেউ আসেননি। আজ জেলা পরিষদের প্রশাসকই প্রথম আমাদের বাড়িতে এসে খোঁজখবর নিয়েছেন। এটি কতটা যন্ত্রণার তা বলে বোঝাতে পারবো না।’
ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর শুনে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন এবং অসুস্থ হয়ে যান বলেও জানান আবদুল বাছির। এদিকে, নজরুলের মৃত্যুর খবর শুনে তার ফুফু আবেদা বেগম ওই দিন রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বলে জানান তিনি।
আবদুল বাছির বলেন, ‘আমার ছেলে কী করেছে, আমি জানি না। একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। আমি আমার ছেলের মরদেহ দেশের মাটিতে ফিরে পেতে চাই।’
পরিবারটিকে সান্ত্বনা দিয়ে জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম সিরাজ বলেন, রাষ্ট্রীয় খরচে নজরুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলবেন তিনি। এ ছাড়া জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে পরিবারটিকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
এ সময় তার সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মাওলানা গাজী নিয়াজুল করিমসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
পরিবারের সচ্ছলতার আশায় ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের কৃষক পরিবারের সন্তান নজরুল ইসলাম (২২)। সেখানে যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় মক্কায় একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করে সৌদি পুলিশ। পরবর্তী তিন বছর তিন মাস কারাগারে থাকার পর গত ১৪ অক্টোবর বুধবার নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সৌদি সরকার।
দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) জানিয়েছে, সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কাজের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুজন হলেন নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার।