নির্বাচনের ১০ মাসেও এমপি পায়নি একটি আসনের ৬ লাখ মানুষ

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের প্রায় ১০ মাস পার হতে চললেও এখনও সংসদ সদস্য (এমপি) পায়নি চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৯ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ড) আসনের অন্তত সাড়ে ছয় লাখ মানুষ। কবে নাগাদ তারা এমপি পাবেন, তা নিশ্চিত করে জানাতে পারছেন না আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা। রাজনৈতিক নেতারাও এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছেন না।

এ অবস্থায় জাতীয় সংসদে এলাকার উন্নয়ন, অবকাঠামোগত সংকট ও জনদুর্ভোগের নানা বিষয় তুলে ধরার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় লোকজন। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই বছরের বেশি সময় ধরে সংসদীয় প্রতিনিধি না থাকায় এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে সংকট তৈরি হয়েছে।

ভোটার কত

সীতাকুণ্ড ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৯ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে চট্টগ্রাম-৪ আসন গঠিত। এখানে মোট ভোটার ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৩৮০ জন। ২০২২ সালের সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী সীতাকুণ্ড উপজেলায় জনসংখ্যা চার লাখের বেশি। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের ৯ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডের জনসংখ্যাও দুই লাখের বেশি। ভোটার, শিশু ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের সংখ্যাসহ এই আসনের জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় লাখ।

আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল

গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরী ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৪ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে জয়লাভ করেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পান ৮৯ হাজার ২৬৮ ভোট। কিন্তু ঋণ খেলাপি হওয়ায় ভোটের আগেই আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে আপিল করেন একই আসনে জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী।

গত ৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ ওই লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেন। সেদিন আদেশে বলা হয়, যদি তিনি (আসলাম চৌধুরী) নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে সফল হন, তবে সংশ্লিষ্ট আসনের নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ (যতটুকু প্রার্থী হিসেবে তার জন্য প্রযোজ্য) এ সংক্রান্ত আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। লিভ টু আপিল মঞ্জুর হওয়ার পর আনোয়ার সিদ্দিকী গত ৩১ মার্চ পৃথক আপিল করেন। ২৮ এপ্রিল আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত আপিলটি শুনানির জন্য আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে নির্ধারণ করেন।

অন্যদিকে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহালের হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে ব্যাংক এশিয়া পিএলসি একটি লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) করে। যমুনা ব্যাংক পিএলসিও হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে একটি আবেদন করে। এর ধারাবাহিকতায় শুনানি হয়।

আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা নিয়ে আপিল শুনানিতে ১০ জুন আপিল বিভাগ অ্যামিকাস কিউরি (আইনি সহায়তাকারী) হিসেবে মতামত দিতে জ্যেষ্ঠ দুই আইনজীবীর নাম ঘোষণা করেন। অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম কামরুল হক সিদ্দিকী ও প্রবীর নিয়োগী শুনানিতে অংশ নেন।

জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির শুনানি করেন, সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন ও যায়েদ বিন আমজাদ।

আসলাম চৌধুরীর পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন এবং মো. মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী, সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী রোকন উদ্দিন মো. ফারুক। এ ছাড়া ব্যাংক এশিয়ার পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কামাল উল আলম এবং যমুনা ব্যাংকের পক্ষে আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির শুনানি করেন। গত ৩০ জুন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিলের রায় দেন। 

এখন কী হবে

এই প্রেক্ষাপটে আসনটিতে কি আবার নির্বাচন হবে, নাকি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে—এমন আলোচনা সামনে আসে। যা এখনও ঝুলে আছে। আসেনি কোনও সমাধান।

রায়ের পর এক ব্রিফিংয়ে আনোয়ার সিদ্দিকীর আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেছিলেন, ‘আসলাম চৌধুরী ঋণখেলাপি হিসেবে এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, আর নির্বাচনে তার এই অংশগ্রহণ অবৈধ ঘোষিত হয়েছে এই রায়ের মাধ্যমে। অর্থাৎ আসলাম চৌধুরী অযোগ্য প্রার্থী হলেন। অযোগ্য প্রার্থী হওয়ার পরে আসনটিতে (চট্টগ্রাম-৪) কী হবে, তা আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে বিস্তারিত জানা যাবে।’

শিশির মনির আরও বলেছিলেন, ‘তবে কোনও আসনে প্রথম হওয়া ব্যক্তি অযোগ্য হলে সাধারণত দ্বিতীয় যিনি থাকেন (ভোটে দ্বিতীয় হওয়া) তাকে নির্বাচিত ঘোষণা করাটাই সাধারণ নিয়ম। কিন্তু এর বাইরেও আপিল বিভাগ বিশেষ কোনও নির্দেশনা দেন কি না, সে ব্যাপারটি পরিপূর্ণ রায় প্রকাশিত হলে জানা যাবে।’

তবে চট্টগ্রাম-৪ আসনে আবার নির্বাচন হলে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর অংশ নিতে বাধা থাকবে না বলে মনে করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।

আপিল বিভাগের রায়ের পর নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছিলেন, ‘দেখুন, একজন ব্যক্তির একটি নির্দিষ্ট সময়ের অযোগ্যতা তো সারা জীবন থাকবে না। পূর্ববর্তী নির্বাচনে যে কারণে আপিলটি মঞ্জুর হলো তার (আসলাম চৌধুরী) নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও, তিনি হয়তো সেই নির্বাচনের ফলাফলটি ভোগ করতে পারবেন না। পরবর্তী নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি যদি সে অযোগ্যতা কাটিয়ে যোগ্য হন, তার তো নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত কোনও বাধা থাকার কথা না।’

যা বলছে স্থানীয় বিএনপি

সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমল কদর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী। তিনি যোগ্য বলেই এলাকার মানুষ তাকে ভোট দিয়েছেন। অথচ নির্বাচনের ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি এমপি হিসেবে শপথ নিতে পারেননি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম-৪ আসন জনপ্রতিনিধিশূন্য আছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি ঋণ খেলাপি। আওয়ামী লীগ সময়ে ব্যবসা করতে পারেননি। দীর্ঘদিন কারাভোগ করেছেন। তাকে সুযোগ দিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘এলাকার মানুষ অনেক আশা নিয়ে তাকে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় এলাকার সমস্যা, সম্ভাবনা ও উন্নয়ন নিয়ে জাতীয় সংসদে কথা বলতে পারছেন না তিনি। আবার তার প্রার্থিতা বাতিলের পর এখন নির্বাচন হবে না কি, কীভাবে সমস্যার সমাধান হবে সে বিষয়েও নির্বাচন কমিশন কিছু বলেনি। আমরাও এ বিষয়ে পরিষ্কারভাবে কিছু বলতে পারছি না।’

একই কথা বলেছেন সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব কাজী মোহাম্মদ মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘এই আসনে সংসদ সদস্য না থাকায় নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ এই আসনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অনেকটা থমকে আছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। জাতীয় সংসদে এলাকার সমস্যা, সম্ভাবনা ও উন্নয়ন নিয়ে কথা বলার মতো কোনও জনপ্রতিনিধি নেই। ভোট হবে কি না, তাও জানি না।’

তিনি বলেন, ‘যতদিন পর্যন্ত নির্বাচিত সংসদ সদস্য শপথ গ্রহণ করতে পারছেন না, ততদিন এই আসনের জন্য একজন সমন্বয়ক জনপ্রতিনিধি প্রয়োজন। এমন একজনকে দায়িত্ব দেওয়া উচিত, যার কথা এলাকার সব পক্ষ শুনবে। যিনি এলাকার সমস্যা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।’

রিভিউ করবেন আসলাম চৌধুরী

বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আপিল বিভাগের রায়ের কপি এখনও হাতে পাইনি। রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর আমি রিভিউ করবো। আশা করছি ফলাফল আমার পক্ষেই আসবে।’

আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা কিছু বলতে পারছেন না

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রাম-৪ আসন নিয়ে আমাদের কাছে এখনও কোনও নির্দেশনা আসেনি। নির্বাচন কমিশন ও আদালত থেকে সে নির্দেশনা আসবে আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’