মানব পাচারকারীদের আস্তানা

কেউ কাজের আশ্বাসে বিক্রি, কেউ বিনা খরচে মালয়েশিয়া যাওয়ার আশায় বন্দি

কাউকে বলা হয়েছিল, টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরে সেতু নির্মাণের কাজ দেওয়া হবে। কাউকে আবার কোনও খরচ ছাড়াই মালয়েশিয়া পাঠানোর আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। এমন নানা প্রলোভনে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজনকে এনে আটকে রাখা হয় টেকনাফের রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড়ের একটি আস্তানায়। সেখানে অস্ত্রধারীদের পাহারায় চলত মারধর ও নির্যাতন। মুক্তির বিনিময়ে দাবি করা হতো টাকা। তাদের কয়েকজনকে আবার টাকার বিনিময়ে অন্যদের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকালে যৌথ বাহিনীর অভিযানে ওই আস্তানা থেকে ৫৭ জনকে উদ্ধার করা হয়। তাদের একজন তারেকুল ইসলাম (২৩)। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গন্ডামারা এলাকার এই তরুণ পেশায় রাজমিস্ত্রি। কাজের সন্ধানে থাকা অবস্থায় দুই রোহিঙ্গা যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। তারা টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরে সেতু নির্মাণের কাজ দেওয়ার কথা বলে তাকে নিয়ে যান। পরে বাহারছড়া ইউনিয়নের বড়ডেইল এলাকা পেরিয়ে পাহাড়ের ভেতরে একটি আস্তানায় আটকে রাখা হয় তাকে।

তারেকুলের ভাষ্য, গত ২ নভেম্বর তাকে সেখানে নেওয়া হয়। এরপর থেকে বন্দি ছিলেন তিনি। মাঝেমধ্যে রান্না করা খাবার পেলেও অধিকাংশ সময় খেতে দেওয়া হতো লাউ ও ডাল। তার সঙ্গে একই কক্ষে আটকে ছিলেন আরও ৫৫ থেকে ৬০ জন।

ফেনীর দাগনভূঞার নুর কামালের (২১) ঘটনাটি ছিল ভিন্ন। তাকে বিনা খরচে মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। শর্ত ছিল, সেখানে পৌঁছানোর পর টাকা পরিশোধ করতে হবে। প্রস্তাবে রাজি হয়ে গত ২ নভেম্বর বাড়ি ছাড়েন তিনি। ৩ নভেম্বর কক্সবাজারে পৌঁছানোর পর এক ব্যক্তি তাকে টেকনাফের পাহাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে নিয়ে আটকে রাখেন। এরপর শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন। নুর কামাল জানান, অস্ত্রধারী ১০ থেকে ১২ জন সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকতেন। তাদের বিরুদ্ধে যায়, এমন কিছু বললেই বন্দীদের মারধর করা হতো।

বিদেশযাত্রার আশ্বাসে বন্দিত্ব

গতকাল শুক্রবার (৬ নভেম্বর) টেকনাফ থানায় নুর কামাল বলেন, বিনা খরচে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রস্তাব দিয়ে এক ব্যক্তি তাকে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত করেন। সেখানে জানানো হয়, মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর টাকা দিতে হবে। ভালো সুযোগ মনে করে তিনি বাড়ি থেকে রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু কক্সবাজারে পৌঁছানোর পরই তাকে পাহাড়ের আস্তানায় আটকে রাখা হয়।

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার এস এম আসাদুজ্জামান (৫০) জানান, ঘুরতে গিয়ে কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে ইয়ামামুল নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে শিবিরে কাজ দেওয়ার কথা বলে তাকে ডেকে নেওয়া হয়। গত ২৯ অক্টোবর তাকে সেখান থেকে নিয়ে যাওয়ার পর মুঠোফোনসহ সঙ্গে থাকা সবকিছু কেড়ে নেওয়া হয়। রাতে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে পাহাড়ে নিয়ে তাকে ১০ হাজার টাকায় মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

আসাদুজ্জামান বলেন, পরে দুই লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে পাচারকারীদের সঙ্গে সমঝোতা হয়। তাকে মুক্তি দিতে রাজিও হয়েছিল চক্রটি। তবে তার আগেই যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরু হয়।

আসাদুজ্জামানের বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের ওই আস্তানায় তার মতো অর্ধশতাধিক মানুষকে আটকে রাখা হয়েছিল। অস্ত্রধারীরা তাদের পাহারা দিতেন। তাদের কাছে প্রায় ১৩০টি দা এবং একে-৪৭-এর মতো ভারী অস্ত্রও ছিল বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি জানান, অভিযানের দুই দিন আগে একটি ট্রলারে করে সাগরপথে যাত্রার প্রস্তুতি চলছিল। তাকেসহ আরও পাঁচজনের সঙ্গে ট্রলারে তোলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু জায়গা না থাকায় সেদিন নেওয়া হয়নি। এরপরই তিনি দুই লাখ টাকায় মুক্তির মৌখিক চুক্তি করেন।

এক লাখ টাকায় বিক্রির অভিযোগ

উখিয়ার বাসিন্দা সাইফুল ইসলামের অভিযোগ, কাজ দেওয়ার কথা বলে নূর আলী নামের এক দালাল তাকে মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেন। পরে ওই চক্রের সদস্যদের কাছ থেকেই তিনি জানতে পারেন, তাকে এবং আরেকজনকে এক লাখ টাকায় কিনে নেওয়া হয়েছে।

সাইফুলের দাবি, সেখানে পাঁচ দিন অবস্থানকালে প্রতিদিন চার-পাঁচজন নতুন মানুষকে নিয়ে আসতে দেখেছেন তিনি। কেউ কথা বলার চেষ্টা করলেই তাকে মারধর করা হতো। বন্দিরা পালানোর চেষ্টা করেও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। একপর্যায়ে তাদের লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। দিনে দুই বেলা খাবার দেওয়া হতো। খাবার হিসেবে থাকত লাউ ও ডাল।

উদ্ধার ৫৭ জন, আটক পাঁচ

যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর টেকনাফ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) সুকান্ত চৌধুরী জানান, উদ্ধার হওয়া ৫৭ জনের মধ্যে একজনকে মানব পাচারকারী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। বাকি ৫৬ জন ভুক্তভোগী। তাদের নাম-ঠিকানা যাচাই করে ৩৭ জনকে গতকাল রাতে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অন্যদের থানায় রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের (আইএসপিআর) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, অভিযানের সময় মানব পাচারকারীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর গোলাগুলি হয়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে সেনাবাহিনীর সৈনিক তিতাস শেখ (২৭) নিহত হন।

অভিযানে মানব পাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, দেশীয় তৈরি একটি বন্দুক ও চারটি গুলি উদ্ধার করা হয়। সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন, বিজিবি ও পুলিশ যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করে।

টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, পাহাড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। শীত মৌসুমে মানব পাচারকারীদের আনাগোনাও বেড়েছে। পাহাড়ের এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সাঁড়াশি অভিযান জরুরি।