মাদারীপুরে খালের জায়গা দখলে নিতে প্রভাবশালীদের ষড়যন্ত্র!

মাদারীপুরমাদারীপুরের তাঁতিবাড়ি এলাকার একটি খালকে গত বছর সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে ভিটে শ্রেণি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। মূলত জায়গা ইজারা পেতে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে স্থানীয় এক প্রভাবশালী খালকে ভিটায় রূপান্তরের নীলনকশা করেন। যার অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসন খাল পাড়ে গড়ে ওঠা দোকান উচ্ছেদ করেছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। দীর্ঘদিন ধরে ওই জায়গায় তারা ঘর তুলে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে ওই জায়গা ইজারা দিতে কোনও নোটিশ না দিয়ে খাল পাড়ে গড়ে ওঠা দোকান ভেঙে ফেলে স্থানীয় প্রশাসন। এ সময় দোকানের মালামালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জেলা প্রশাসন ও সদর উপজেলা প্রশাসনের নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মাদারীপুর সদর উপজেলার তাঁতিবাড়ি বাজারে ঘটমাঝি ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ৭২ নম্বর ঝিকরহাটি মৌজার বিআরএস ১ নম্বর খাস খতিয়ানের ২৩১৩ নম্বর দাগের জমিটি একটি সরকারি খাল। এখানে জমির পরিমাণ ২৪ শতাংশ। খালটি তাঁতিবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে আর দক্ষিণদিকে বিস্তৃত। এই তাঁতিবাড়ি ব্রিজের গোড়া থেকে তাঁতিবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত খাল পাড়ে দুই শতাধিক দোকান গড়ে ওঠেছে। কয়েক বছর ধরে স্থানীয়রা ব্যবসা করায় সেখানে একটি বাজারও গড়ে ওঠে। খালের কোনও পরিবর্তন না করে নিচ থেকে পিলার তুলে দোকান তৈরি করে স্থানীয়রা। তবে তাঁতিবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনের খালের মধ্যে কিছু অংশ (১৫ ফিট জায়গা) বালু দিয়ে ভরাট করেন স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি।

মাদারীপুর সদর উপজেলা ভূমি অফিসের একটি নোটিশে গত ১৬-০৭-২০১৩ তারিখে স্থানীয় সালাম মাতুব্বর, সিরাজ খান, রশিদ মাতুব্বর, মুকুল মাতুব্বর, মতলেব হাওলাদার ও কালাই মাতুব্বরকে বালু ভরাট না করতে এবং স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ঘটনায় অন্যরা দোষী না হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আইন ভঙ্গের অভিযোগে দেড় বছর আগে আব্দুর রশিদ মাতুব্বর নামের এক ব্যক্তিকে কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক ও তৎকালীন মাদারীপুরের ভূমি সহকারী কমিশনার ঝুমুর বালা।

স্থানীয় সাধারণ মানুষ ছোট-বড় দোকান তৈরি করলেও স্থানীয় ওই প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রশাসনের সহযোগিতায় ২৪ শতাংশ জমি নিজের আত্মীয়ের নামে লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা করে। যেখানে স্থানীয়রা খাল বহাল রেখে দোকানপাট নির্মাণ করে সেখানে ওই খালের জায়গাকে ভরাট দেখিয়ে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বাবর আলী মীর।

বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের বিষয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রস্তাব অনুযায়ী সরেজমিন তদন্ত করে দেখা যায়, ওই জমি খাল শ্রেণি হতে পরিবর্তিত হয়ে ভিটা শ্রেণিতে রূপান্তর হয়েছে। এক্ষেত্রে কারও আপত্তি থাকলে ১৪ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে অবহিত করার জন্য বলা হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এই শ্রেণি পরিবর্তনের তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। খালটি এখনও বহমান। প্রভাবশালী মহলকে ওই জায়গা বরাদ্দ বা ইজারা বন্দোবস্ত দেওয়ার জন্য এটা করা হয়েছে। আর তাই খালের পাশে থাকা সাধারণ মানুষের দোকানপাট ভেঙে জায়গা খালি করে ওই খালের জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার পায়তারা চলছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাঁতিবাড়ি ব্রিজ থেকে শুরু করে হাইস্কুল পর্যন্ত শতাধিক দোকান থাকলেও ভাঙা হয়েছে ২৩১৩ নম্বর দাগের খালের ওপর গড়ে ওঠা দোকানগুলো। অথচ এক শতাংশ করে জায়গা বরাদ্দ পেতে অনেক আগেই মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনের কার্যালয়, মুক্তিযোদ্ধার পরিবারসহ ১৪টি পরিবার আবেদন করেন। যেখানে নৌপরিবহনমন্ত্রী, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যানসহ অন্যদের সুপারিশ ছিল।

স্থানীয় বাসিন্দা হাসান ফকির বলেন, খালের পাশে জায়গায় দোকান উঠিয়ে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করি। সরকার যদি বরাদ্দ দেয় তাহলে আমাদেরই দিতে হবে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে আমরা এখানে ব্যবসা করে আসছি, এ জায়াগায় আমাদের দাবিই বেশি।

তিনি আরও বলেন, স্থানীয় প্রভাবশালী ইলিয়াস মোল্লাকে ওই জায়গা বরাদ্দ দিতে আমাদের দোকান ভেঙে ফেলা হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত রাজিয়া বেগম জানান, তার ছেলে নাসির হাওলাদারের দোকান হঠাৎ করেই ভেঙে দিয়েছে প্রশাসন। বাড়ি একটু দূরে হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে খবরটাও জানতে পারিনি।

ক্ষতিগ্রস্ত রুমা বেগম জানান, খাল রক্ষা করে দোকানঘর তৈরি করা হলেও তাদের দোকান ভেঙে ফেলা হয়েছে। অথচ প্রভাবশালী ব্যক্তি খালের জায়গা ভরাট করে গুদামঘর তৈরি করলেও তার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও এনডিসি সাইফুদ্দিন গিয়াস জানান, সরকারি জায়গা দখলমুক্ত করতেই এই অভিযান চালানো হয়। তবে স্থানীয়রা বাধা দেওয়ায় সব দোকান উচ্ছেদ না করেই তাদের চলে আসতে হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক কামালউদ্দিন বিশ্বাস বলেন, সরকারি আইন অনুযায়ীই তাঁতিবাড়িতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

/এসএনএইচ/টিএন/

আপ: এইচকে

আরও পড়ুন:নাটোরে নির্মাণাধীন ব্রিজ ধস, প্রকৌশলীসহ আহত ১০