সাত দিনের রিমান্ডে

বদমেজাজি নাজমুল হুদার কাজই ছিল নির্যাতন করা

শিশু সাগর বর্মণ (১০) এর শরীরে বাতাস ঢুকিয়ে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত জোবেদা টেক্সটাইলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা নাজমুল হুদা বরাবরই বদমেজাজি স্বভাবের। কারখানার বিভিন্ন ফ্লোরে ঢুকে শ্রমিকদের হেনস্থা ও শাস্তি দেওয়াই ছিল তার কাজ। তার ভয়ে তটস্থ থাকতো সব শ্রমিক। প্রায় প্রতিদিনই তিনি কোনও না কোনও শ্রমিককে নানা উপায়ে শাস্তি দিতেন। তবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর শাস্তি ছিল কম্প্রেসারের বাতাসের সামনে কাউকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া। বাতাসের তীব্র চাপে শাস্তি প্রাপ্তরা কাঁদতো, চিৎকার করতো আর তা তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করতেন নাজমুল হুদা ও তার সঙ্গীরা। 

জোবেদা টেক্সটাইলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা নাজমুল হুদাকে গ্রেফতার করে পুলিশ   

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় জোবেদা টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলে ১০ বছরের শিশু শ্রমিক সাগর বর্মণ ও তার বাবা রতন বর্মণ এর আগেও কয়েকবার প্রশাসনিক কর্মকর্তা নাজমুল হুদার নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। ঠিকমতো কাজ না করার অভিযোগ এনে এর আগেও বাবা ও ছেলেকে কম্প্রেসারের মেশিনের হাওয়া শরীরে দিয়ে নির্যাতন করেছিলেন নাজমুল হুদা। এমন কাজ তিনি প্রায়ই করতেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি সাগরের মাথায় এর আগে সুতার কোন ছুড়ে মারাও হয়েছিল। এতে তার মাথা ফেটে গিয়েছিল এবং কয়েকটি সেলাইও দিতে হয়েছিল। কিন্তু, এমন নৃশংসতার পরেও কর্তৃপক্ষের মন নরম হয়নি। এ ঘটনার পর কয়েকদিন কাজে আসতে না পারায় সে কয়দিনের বেতনও কেটে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন নাজমুল হুদা।

শিশু সাগর বর্মণকে হত্যার ঘটনার পর বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে জোবেদা টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলের ভেতরে শিশু ও শ্রমিক নির্যাতনের এসব কাহিনী। সাগর হত্যায় দায়ের করা মামলার বিবরণসহ নিহতের ভাবি অঞ্জনা রাণী, জোবেদা টেক্সটাইলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

সাগর হত্যা মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, নাজমুল হুদার সঙ্গে এ ঘটনায় আরও কয়েকজন লাইনম্যান ও সুপারভাইজার এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত।

সাগর বর্মণ। রবিবার কাজে অবহেলার অভিযোগে পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।

এদিকে, সাগর নিহত হওয়ার পর পুলিশ নাজমুল হুদাকে গ্রেফতার করে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার ফোরকান শিকদার জানান, আরও তথ্যের জন্য গ্রেফতারকৃত নাজমুল হুদাকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। সেজন্যই রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক হাবিবুর রহমান জানান, নারায়ণগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশেক ইমাম এর আদালতে শুনানি শেষে আদালত ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

সাগর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতার নাজমুল হুদা এজাহারভুক্ত আসামি। সোমবার সকালেই তাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।

নাজমুল হুদা গোপালগঞ্জের মোকছেদপুর এলাকার আলমগীর হোসেনের ছেলে। তিনি গত ৮ বছর ধরে জোবেদা টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

নাজমুল হুদার ঘনিষ্ঠ একজন কর্মকর্তা জানান, জোবেদা টেক্সটাইল মিলের ৫টি সেকশন রয়েছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তা নাজমুল হুদা মূলত বিভিন্ন সেকশনে গিয়ে কাজ তদারকি করেন। দুই শিফটে কারখানায় কাজ হয়। সকাল ৬টা হতে দুপুর ২টা ও দুপুর ২টা হতে রাত ১০টা পর্যন্ত দুই শিফটে কাজ চলে। নাজমুল হুদা দুপুর ১২টার পর থেকেই বিভিন্ন ফ্লোরে গিয়ে শ্রমিকদের দেখভাল করেন। কোনও ফ্লোরে শ্রমিকদের কেউ ঠিকমতো কাজ না করলে নাজমুল হুদা যখন ফ্লোরে যান তখন তাকে নালিশ দেওয়া হয়।

জোবেদা টেক্সটাইল মিলস এর প্রবেশ দ্বার

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, রবিবার দুপুর ১২টার দিকে তিনি ঘটনা শুনে গিয়ে দেখেন সাগর শুয়ে কাঁতরাচ্ছে। পরে তাকে বের করে নেওয়া হয়।

তিনি আরও জানান, নাজমুল হুদা বদমেজাজি হওয়ায় অনেকেই তাকে ভয় পেতেন। তার ভয়ে তটস্থ ছিল সবাই।

এদিকে, সাগর হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় নিহতের বাবা রতন বর্মণ উল্লেখ করেন, জোবেদা টেক্সটাইলের ৫নং ইউনিটে সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টায় প্রথম শিফটে রতন বর্মণ ও তার ছেলে সাগর বর্মণ কাজ করতেন। প্রতিদিনের মতো রবিবারও তারা কাজ করতে থাকেন।

জোবেদা টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা নাজমুল হুদাসহ অজ্ঞাত ৩ থেকে ৪ জন লাইনম্যান ও সুপারভাইজার প্রায় সময়ই সামান্য ত্রুটি দেখিয়ে রতন বর্মণ ও ছেলে সাগর বর্মণকে মারধরসহ গালমন্দ করতো। তারাই কমপ্রেসারের মেশিনের নল পায়ুপথে ঢুকিয়ে ছেলে সাগর বর্মণকে হত্যা করে।

শিশু সাগর বর্মণের মৃত্যুর ঘটনায় মামলায় রবিবার রাতে ওই মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলায় উপরোক্ত ৪জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত পরিচয় আরও ৬জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে নাজমুল হুদা ছাড়া অন্যরা পলাতক রয়েছে। ঘটনার পর থেকে তারা আত্মগোপনে। বন্ধ রয়েছে মোবাইল নম্বরও।

এদিকে, সোমবার নিহত সাগর বর্মণের ভাবি অঞ্জনা রাণী বাংলা ট্রিবিউনের কাছে অভিযোগ করেছেন পেটে বাতাস ঢুকিয়ে হত্যার শিকার শিশু সাগরকে এর আগেও অনেকবার নির্যাতন করা হয়েছিল। এমনকি তার বাবা রতন বর্মণকেও বিভিন্ন সময়ে নির্যাতন করতেন জোবেদা টেক্সটাইলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা নাজমুল হুদা।

নিহত সাগরের বাবা তপন বর্মণ

সোমবার সাগরের বাবা রতন বর্মণের মোবাইলে ফোন করলে সেটা ধরেন তার পুত্রবধূ অঞ্জনা রাণী। নিহত সাগরের বড় ভাইয়ের স্ত্রী অঞ্জনা রাণী বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, জোবেদা টেক্সটাইল মিলের ৫ নম্বর সেকশনে কাজ করতো সাগর। মাসে বেতন পেতো ৩ হাজার ১শ’ টাকা। আর তিনি (অঞ্জনা রাণী) ও তার শ্বশুর রতন বর্মণ কাজ করতেন ৪ নম্বর সেকশনে। তিন ভাইয়ের মধ্যে সাগর ছিল সবার ছোট। মূলত পরিবারের অভাব অনটনের কারণেই বাবা ছেলে ও ছেলের বউ কারখানাতে কাজ করতো। গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে একবার সাগরের মাথায় সুতার কোন ফেলে দেয় কয়েকজন কর্মকর্তা। এতে তার মাথা ফেটে যায়। কিন্তু গরিব হওয়ায় চাকরির কারণে তখন আমরা কিছুই বলতে পারিনি। কারণ কিছু বলতে বা করতে গেলে আমাদের চাকরি চলে যেত। ওই সময়ে সাগরকে হাসপাতালে নিয়ে মাথায় ৫-৬টা সেলাই দেওয়া হয়েছিল। যে কয়দিন কাজে যেতে পারেন নাই সে কয়দিন হাজিরা থেকে বেতনও কাটা হয়েছিল। রবিবার তো সাগরকে একেবারে মেরেই ফেলেছে ওরা। আমরা গরীব মানুষ তাই খুব কষ্টে আছি। লাশ আনতেও আমাদের টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এদিকে, নিহতের বাবা রতন বর্মণ দাবি করেছেন, জোবেদা টেক্সটাইলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা নাজমুল হুদা ও আরও কয়েকজন লাইনম্যান ও সুপারভাইজার তাকে ও তার ছেলে রতনকে মাঝে মাঝেই নানা অভিযোগে নির্যাতন করতো। তাদের এর আগেও হাওয়া মেশিনের সামনে দাঁড় করানো হয়েছিল।এ কাজ করে মজা পেতেন নাজমুল হুদা।এজন্য প্রায়ই তাদের নামে কয়েকজন লাইনম্যান ও সুপারভাইজার নাজমুল হুদার কাছে অভিযোগ আনতো।তাদের ছাড়াও আরও অনেককেই ওই মেশিনের সামনে দাঁড় করানো হতো। 

উল্লেখ্য, রবিবার রূপগঞ্জে অবস্থিত জোবেদা টেক্সটাইলে কাজে অবহেলার অভিযোগ এনে রতন বর্মণ নামে ১০ বছরের একটি শিশু শ্রমিককে কম্প্রেসার মেশিন দিয়ে পায়ুপথে হাওয়া দেওয়া হয়। এতে বাতাসের চাপে রতন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সেখানেই দুপুরে তার মৃত্যু হয়। গত বছর খুলনায় রাকিব নামে আরেক কিশোর শ্রমিককে পায়ুপথে হাওয়া ঢুকিয়ে হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট গ্যারেজের মালিক ও কর্মচারীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছে নিম্ন আদালত। মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

 /টিএন/

আরও পড়ুন:

রূপগঞ্জের ওই কারখানা থেকে ২৪ শিশু উদ্ধার